× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর

কূটনীতিতে নতুন সম্ভাবনা

হাবিব বাবুল

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৫৮ মিনিট আগে

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাৎকালে। ছবি: সংগৃহীত

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাৎকালে। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল তার প্রথম চীন সফর এবং সামগ্রিকভাবে প্রথম দিককার উচ্চপর্যায়ের বিদেশ সফরগুলোর একটি। সফরটি এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বৈশ্বিক রাজনীতি দ্রুত বহুমেরুকেন্দ্রিক রূপ নিচ্ছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় চীন, ভারত ও অন্যান্য শক্তির মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে এই সফরকে শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা কমানোর বিষয়ে অগ্রগতি অর্জন করা। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে তার বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জনের মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী চীনের বাজারে আরও বেশি বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া। প্রধানমন্ত্রী চীনের কাছে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। চীনও বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি মানসম্পন্ন পণ্য আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এই ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ সফল হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।

অবকাঠামো খাতেও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার চীনের কাছে বিভিন্ন বৃহৎ প্রকল্পে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চেয়েছে। বিশেষ করে সড়ক, সেতু, পরিবহন ও শিল্পায়ন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো আলোচনায় এসেছে। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ এবং সম্ভাব্য নতুন বিনিয়োগ বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তিস্তা প্রকল্প ও নদী ব্যবস্থাপনা সহযোগিতাও সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা ইস্যু বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই প্রেক্ষাপটে তিস্তা অববাহিকার উন্নয়ন এবং নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আঞ্চলিক কূটনীতির একটি সংবেদনশীল ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচিত হবে।

তবে সফরের মূল্যায়ন করতে গিয়ে শুধু অর্জনের তালিকা তৈরি করলেই চলবে না। এর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে একদিকে ভারতের সঙ্গে তার গভীর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে চীন বর্তমানে অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারী। ফলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।

প্রশ্ন উঠছে, এই সফরের ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না। এ পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য কোনো কড়া প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এটিও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। কারণ নয়াদিল্লি জানে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই ভারতবিরোধী অবস্থান গ্রহণ নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আধুনিক বাস্তবতায় অধিকাংশ রাষ্ট্রই বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করে থাকে।

তবে ভারতের উদ্বেগের জায়গা নেইÑ এমনটিও বলা যাবে না। বিশেষ করে তিস্তা প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দরসংক্রান্ত সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ভারত সতর্ক নজর রাখবে। অতীতে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে চীনের সক্রিয় উপস্থিতি ভারতকে কৌশলগতভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে।

তবে বর্তমান সফরের ঘোষিত এজেন্ডা মূলত অর্থনীতি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাকেন্দ্রিক। কোনো সামরিক বা নিরাপত্তাভিত্তিক জোট কিংবা কৌশলগত সমঝোতার বিষয় সামনে আসেনি। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হবেÑ এমন আশঙ্কার পক্ষে এখনও শক্ত ভিত্তি দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে বাস্তববাদী ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির অংশ হিসেবেই দেখা যেতে পারে। একদিকে ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার এবং আঞ্চলিক সংযোগের প্রধান মাধ্যম। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন সহযোগী এবং প্রযুক্তিগত অংশীদার। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের দাবি হলোÑ দুই দেশের সঙ্গেই কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।

সাম্প্রতিক বিশ্ব-রাজনীতিতে ‘এক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই অন্য পক্ষের বিরোধিতা’Ñ এই ধারণা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। অনেক দেশই একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়। তবে ঝুঁকির বিষয়ও রয়েছে। চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ-নির্ভর উন্নয়ন যেন ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এমন কোনো বার্তা দেওয়া যাবে না, যাতে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি পক্ষ হিসেবে দেখা হয়।

তারেক রহমানের এই সফরের আরেকটি তাৎপর্য হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানকে দৃশ্যমান করা। সফরের মাধ্যমে তিনি বার্তা দিয়েছেন যে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে চায়। একই সঙ্গে চীনও বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।

সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ। বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে ঘোষিত উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতার ওপর।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কোনো ফাটল দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বর্তমানে স্পষ্ট নয়। বরং দক্ষ ও দূরদর্শী কূটনীতি অনুসরণ করতে পারলে ঢাকা একই সঙ্গে বেইজিং ও নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ পাবে। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পরিচালিত পররাষ্ট্রনীতিই হতে পারে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা।


লেখক: হাবিব বাবুল (জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা