× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্মেলন এবং সম্ভাবনা

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্মেলন এবং সম্ভাবনা

সম্প্রতি ঢাকায় বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছেÑ যেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ 

১. আবেদনের সাত দিনের মধ্যে যদি অনুমোদন না হয়, তাহলে সেই লাইসেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয়ে যাবে, 

২. দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা হবে এবং 

৩. উন্নত বাংলাদেশ গড়তে সরকার প্রয়োজনে সবকিছু করবে। এ রকম আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে এই বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্মেলনে। 

সিদ্ধান্তগুলো শুনতে যতটা সুন্দর, বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে সেটাই দেখার বিষয়। কেননা আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে আমরা ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণে যতটা পারদর্শী, ঠিক ততটাই ব্যর্থ সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে। এই সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো কি অতীতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে, নাকি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবে কার্যকর হবে এবং দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে শুদুমাত্র সম্মেলন করে কি বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। বিনিয়োগের জন্য ভালো প্রচারণা এবং ইমেজ তৈরির প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেজন্য বিশেষ পরিকল্পনা এবং কার্যক্রম গ্রহণ করতে হয়। আনুষ্ঠানিক সম্মেলনে কিছু মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। প্রথমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন যে কী ধরনের বিনিয়োগ আমরা উৎসাহিত করতে চাই। সাধারণত দুই ধরনের বিনিয়োগ হয়ে থাকে। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ। প্রথমোক্ত বিনিয়োগ দেশের ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তা শ্রেণির কাছ থেকে আসে। পক্ষান্তরে বৈদেশিক বিনিয়োগ বিদেশি ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আসে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা যদি দেশে বিনিয়োগ করেন, তাহলে তারাও এই ক্যাটাগরিতে পড়তে পারেন। আমাদের দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাপক হারে বিনিয়োগের দৃষ্টান্ত খুব একটা নেই। 

বৈদেশিক বিনিয়োগ আবার তিন ক্যাটাগরিতে হতে পারে। প্রথমত পোর্টফোলিও বিনিয়োগ অর্থাৎ শেয়ার ক্রয় করে। দ্বিতীয়ত, সরাসরি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। তৃতীয়ত দেশের কোনো ব্যবসায়ীর সাথে যৌথ মালিকানায় ব্যবসা স্থাপন করেও বিনিয়োগ হতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে অর্থাৎ পোর্টফোলিও বিনিয়োগে বিদেশি অর্থ আমাদের দেশের জন্য সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা আমাদের দেশের পুঁজিবাজার এই ধরনের বিনিয়োগের ঝুঁকি সামাল দেওয়ার জন্য এখনও প্রস্তুত নয়। তা ছাড়া এই ধরনের বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে না। উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জিডিপিতে এই ধরনের বিদেশি বিনিয়োগে কোনো রকম অবদান থাকে না। বড়জোর শেয়ার মার্কেট চাঙ্গা হতে পারে। আর যে দুই পদ্ধতি আছে, অর্থাৎ সরাসরি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা যৌথ উদ্যোগে পুঁজি বিনিয়োগ, সেখানেই প্রকৃত বিনিয়োগ হয়ে থাকে। কিন্তু এই দুই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ আগে বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের আভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ এবং বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। দেশে যখন অভ্যন্তরীণ বা নিজস্ব ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, তখনই বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়। পক্ষান্তরে দেশে যখন অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে স্থবিরতা বা মন্দা অবস্থা বিরাজ করে, তখন বিদেশি বিনিয়োগ মুখ ফিরিয়ে নেয়। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে, প্রথমে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে।

দেশি বিনিয়োগ হোক, আর বিদেশি বিনিয়োগ হোক না কেন, সবার আগে বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা প্রয়োজন। বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত না করতে পারলে, যতই সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হোক না কেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে না, তা সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ হোক, আর বিদেশি বিনিয়োগ হোক। আমরা কি দেশে বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পেরেছি। ব্যবসাবাণিজ্য এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার যে চিত্র আমরা প্রতিনিয়ত লক্ষ্য করছি, তাতে দেশে বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে, এমন দাবি করা যাবে না। দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আছে ঠিকই। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সেভাবে নিশ্চিত হয়নি। একধরনের অস্থিরতা এবং উত্তেজনা বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীরা এখনও আস্থা রাখতে পারছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে দেশের ব্যবসায়ীরা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাতে তাদের মনোবল ভেঙে গেছে। ব্যবসায়ীরা পুঁজি বিনিয়োগ করে দীর্ঘ মেয়াদ, বিশেষ করে পনেরো থেকে ত্রিশ বছরের লক্ষ্য সামনে রেখে। ব্যবসায়ীরা কীভাবে আশ্বস্ত হবে যে আগামীতে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। আর এই আশ্বাস তো শুধু মুখের কথায় হবে না। পরিবেশ তৈরি করে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস করাতে হবে যে এরকম ঘটনা আর কখনোই ঘটবে না। ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরে না এলে, তারা হয়তো মুখে কিছু না বলে কোনোমতে ব্যবসা চালিয়ে যাবে ঠিকই কিন্তু বিনিয়োগ বৃদ্ধি বা ব্যবসার সম্প্রসারণ করা থেকে বিরত থাকবে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হচ্ছে দেশের বিশৃঙ্খল আর্থিক খাত। বিগত অর্ধ দশক ধরে পুঁজিবাজার যে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে, তাতে বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ সেভাবে নেই। সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট এখনও স্থাপিত হয়নি এবং খুব সহসা যে হবে, তেমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজার থেকে মূলধন বা ঋণ হিসেবে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে না। অত্যন্ত নিরুপায় হয়ে ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ব্যাংক ঋণের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিশাল অঙ্কের বা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখন তো দেশের ব্যাংকিং খাতের যে শোচনীয় অবস্থা তাতে ব্যাংকের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। অনেক ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের অর্থ সঠিকভাবে ফেরত দিতে পারছে না, নতুন ঋণ মঞ্জুর বন্ধ করে রেখেছে এবং অনুমোদন হওয়া ঋণও বিতরণ করতে পারছে না। এরকম দুর্বল ব্যাংকিং খাত নিয়ে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে কীভাবে।

বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থাই শুধু নয়, সেই সাথে আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা অপরিহার্য। দেশের ব্যাংকিং খাতের মানোন্নয়ন করে আধুনিক কিছু সেবা চালু করতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন কাজ হবে। আমাদের দেশের ব্যাংকের সাথে আমেরিকা-কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ ব্যাংকের কোনো করেসপনডেন্ট রিলেশনশিপ নেই। ফলে সেসব দেশ থেকে অর্থ প্রেরণ করতে হয় একাধিক ব্যাংকের মাধ্যমে, যা শুধু সময়সাপেক্ষ নয়, ব্যয়বহুলও বটে। উন্নত বিশ্বের একজন বিনিয়োগকারী যখন দেখবে যে অর্থ প্রেরণ করতে হয় তিন/চারটি ব্যাংকের মাধ্যমে, তখন তারা প্রথম ধাক্কায়ই বিনিয়োগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। 

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের সমুদয় অর্থ নিয়ে এসে বিনিয়োগ করবে তেমন নয়। বৈদেশিক মুদ্রায় যে পরিমাণ ব্যায় করতে হবে, সেই পরিমাণ অর্থ অবশ্যই বৈদেশিক মুদ্রায় নিয়ে আসবে। কিন্তু স্থানীয় মুদ্রায় যে ব্যয় হবে, সেই অর্থ বিদেশ থেকে না এনে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সংগ্রহ করতে চাইবে। কিন্তু এজন্য বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা থাকতে হবে। যেমন আমেরিকা বা ইউরোপের একজন বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিল। এই বিনিয়োগের পাঁচশ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যায় হবে এবং বাকি পাঁচশ কোটি টাকা স্থানীয় মুদ্রায় প্রয়োজন হবে। সেই বিনিয়োগকারী পাঁচশ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসবে এবং বাকি পাঁচশ কোটি টকার স্থানীয় মুদ্রার জন্য তিনি তার দেশের ব্যাংককে ব্যাংলাদেশের কোনো ব্যাংকের ওপর স্ট্যান্ডবাই এলসি খুলতে বলবে, যার বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাংক স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ প্রদান করবে। এখানে স্ট্যান্ডবাই এলসি বাংলাদেশের ব্যাংকের জন্য ঋণের জামানত হিসেবে কাজ করবে। এই ধরনের ব্যাংকিং সেবা আমাদের দেশে এখনও চালু হয়নি। অধিকাংশ ব্যাংকার হয়তো জানেই না যে এভাবে ঋণের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ব্যাংক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ঋণ প্রদান করতে পারে। এটি একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। এরকম আরও অনেক আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা আছে, যা চালু করতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা বেশ কঠিন। এ কারণেই দেশের ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থা দূর করে এই খাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এখানে আধুনিক ব্যাংকিং সেবার প্রচলন করা প্রয়োজন। এমনটা করতে পারলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বৈদেশিক বিনিয়োগও আকৃষ্ট হবে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত করতে হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আর বিনিয়োগ বৃদ্ধির পূর্বশর্ত হচ্ছে দেশে বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করে যদি বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্মেলন করা যায়, তাহলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে। পক্ষান্তরে বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্রে প্রস্তুত না করে যদি বিনিয়োগ সম্মেলন করা হয়, তাহলে সেখান থেকে খুব ভালো কিছু হবে বলে মনে হয় না। তাই সরকারের বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।


লেখক: নিরঞ্জন রায় (সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা )

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা