নূরুদ্দীন দরজী
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
গ্রাফিক্স: সংগৃহীত
আজ আন্তর্জাতিক মাদক প্রতিরোধ দিবস। মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে দিবসটি প্রতি বছর পালিত হয়। ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এক অধিবেশনে প্রতিবছর দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে থেকে জাতিসংওেঘর সদস্য রাষ্ট্রগুলো দিবসটি পালন করে আসছে।
জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদশেও দিবসটি প্রতি বছর পালিত হয়। বর্তমান সরকার সর্বনাশা মাদকের বিরুদ্ধে শক্তিশালী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছে অভিযান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শক্ত কণ্ঠে এ অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির বিশেষ উদ্যোগে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণে ইয়াবা ট্যাবলেট, হেরোইন, গাঁজা অন্যান্যসহ দেশি-বিদেশি নেশা জাতীয় দ্রব্যাদি উদ্ধার করা হয়েছে। অনেক মাদকাসক্ত ও ব্যবসায়ী গ্ৰেপ্তারের আওতায় এসেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ও ভ্রাম্যমাণ আদালত সরেজমিন অভিযান চালিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কারাদণ্ড ও অর্থ জরিমানা করছেন। এছাড়া অনেক এলাকা, গ্ৰাম ও মহল্লার সাধারণ মানুষ মাদকাসক্তদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে এক রকম যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। যুদ্ধ শব্দটির ব্যাপক অর্থ থাকলেও শান্তির জন্য মানুষকে নানা রকম যুদ্ধ করতে হয়। একসময় ফিলিপাইন মাদকের করালগ্ৰাসে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল।
পৃথিবীর প্রথম সভ্য জাতি চীনকে আফিম নামক মাদক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশরা জোরপূর্বক ভারতে আফিম চাষ করিয়ে তার বিশাল রপ্তানি ও চোরাচালান করত চীনে। তারা চীনে আফিমের বিশাল বাজার গড়ে তুলেছিল। আর এর কবলে পড়ে চীনারা তাদের অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ভুলে যেতে বসেছিল। সেই ভয়াবহ অবস্থা থেকে রক্ষার জন্য চীনের মানুষ দুই দুটি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। পৃথিবীতে ওই যুদ্ধ ‘আফিম যুদ্ধ, নামে পরিচিত। সাম্রাজ্যবাদীরা চীনের মতো আরও অনেক দেশে বাণিজ্যের অন্তরালে মাদক পাচার করে সেই সব দেশের মানুষকে বেহুঁশ রেখে অর্থ কামিয়ে নিয়েছে। এমন ঘটনার মধ্যে ফরাসিরা ইন্দোচীনে বিশেষ করে ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ার মানুষকে আফিমের নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র বিরুদ্ধে হেরোইন পাচারের অভিযোগের কথা শোনা যায়। আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে একসময় থাইল্যান্ডের রাজারা আফিম আমদানি করে দেশে বিপদ ডেকে এনেছিল।
বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বেআইনিভাবে দেশের অভ্যন্তরে মাদকদ্রব্য পাওয়ার কথা জানা যায় এবং মাদকসেবীদের দেখা যায়। বিভিন্ন তথ্যমতে, অতি সহজে মাদকের চালান আনা হচ্ছে। বিশ্বে মিয়ানমারে অবৈধভাবে প্রচুর মাদক উৎপাদনের কথা সবাই জানেন। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের কিছু সীমানা মিয়ানমারের সাথে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসের মিলিত স্থান ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’। আবার আফগানিস্তান, ইরান ও পাকিস্তানের মিলিত স্থান ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল ও গোল্ডেল ক্রিসেন্ট হয়ে অতি সহজে ইয়াবা পিল, হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য আমাদের দেশে আসে। দেশের দুর্গম এলাকা ও নদীপথে বৈধ মালামাল পরিবহনের সুবাদে দুষ্টচক্রের দল মাদক নিয়ে আসে। এছাড়া দেশে অঞ্চলভিক্তিক মাদক ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত রয়েছে।
নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অবশিষ্টাংশ তারা বাইরে বিশেষ করে বাংলাদেশ অতি নিকটে থাকায় এখানে পাঠিয়ে দিতে চেষ্টা করে। মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়ার মতো অনেক দেশও মাদক উৎপাদন ও ব্যবসায়ের সাথে কিছু না কিছু জড়িত। চোরাচালান করে তারা অন্যান্য দেশে মাদক পাঠিয়ে দেয়। বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে মিয়ানমারের দুষ্টচক্র এ জাতীয় কারখানা গড়ে তুলছে ও ভাঙছে। এ দেশীয় চোরাচালানিরা নিজেরা সিন্ডিকেট তৈরি করে অন্ধকার পথে তা নিয়ে আসে। নেশাখোরদের মধ্যে কেউ কেউ অনেক প্রভাবশালী, স্বঘোষণায় মাদকসম্রাটও বনে যায়। অথচ বাংলাদেশে কখনও কোনো প্রতিপত্তিশালী সম্রাটের বসবাস ছিল না।
বেশ কয়েকটি মাদকে অবসাদক, উদ্দীপক, প্রশান্তিদায়ক, ভ্রম সৃষ্টিকারী, মরফিন ইত্যাদির প্রভাব রয়েছে। এ সমস্ত মাদক মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা দুর্বল করে দেয়। হৃৎপিণ্ডের গতি বাড়িয়ে ইন্দ্রিয় শক্তিকে বিকৃত করে ফেলে। কখনও বা সাময়িক আনন্দ-ফুর্তিতে মাতিয়ে তোলে। মস্তিষ্ককে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। বাস্তবের সাথে অবাস্তব চিন্তা করে পরিস্থিতিকে মুহূর্তেই ঘোলাটে করে ফেলে। আবোল-তাবোল বকতে দ্বিধা করে না। বর্তমান সময়ে গাঁজাসেবীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এদের বেশিরভাগ তাৎক্ষণিকভাবে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলে বহু পরিবার ও সমাজের ক্ষতি করছে হরহামেশা।
আমাদের দেশের মানুষের বিশেষ চিন্তার কারণ হয়েছে যুবসমাজকে নিয়ে। যুগে যুগে এ দেশবাসী বিদেশি বেনিয়াদের শাসন-শোষণের বঞ্চনায় পড়ে নিঃস্ব হয়েছে। ’৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর ধীরে ধীরে আমরা উন্নয়নের সূচকগুলো স্পর্শ করছি। ইতোমধ্যে বাঙালি জাতি বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে। আর এমন উন্নয়নের জন্য যুবশক্তিই আসল ভরসা। আমরা বারবার শুনেছি তরুণদের জয়গান। তাদের সাহস, বল ও বীরত্ব আমাদের মাঝে আশার আলো জ্বালিয়েছে। দেশ-বিদেশে অবস্থান করে অনেক ক্ষেত্রে তাদের নবতর উদ্ভাবন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীকে চমকিত করে ফেলছে। মানবকল্যাণে তাদের অবদানে আমরা ধন্য। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগ্ৰামে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তরুণ যুব সমাজের ভূমিকা সব সময়ই অগ্ৰগণ্য ছিল। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনসহ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৮০% ভাগেই ছিল তরুণ সমাজ। সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রথমেই তারা এগিয়ে আসে। খেলাধুলা, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র শিল্প ও সাহিত্য চর্চায় বিশ্বব্যাপী তারা নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে চলেছে। এমনি যখন পুষ্প কাননে কুসুমবৃন্ত, মাদকের করালগ্ৰাসে তা ঝরে পড়লে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে।
দেশের উন্নয়ন ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে যুবসমাজকে সুপথে ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। সরকারের পাশাপাশি প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে আন্তরিকভাবে সচেতন হওয়া দরকার। দেশে মাদকবিরোধী আইনের সফল বাস্তবায়ন আবশ্যক। মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনতে সচেষ্ট থাকা অবশ্যই দরকার। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মাদকের কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। পাঠ্য বই-পুস্তকে মাদকের বিষয় অন্তর্ভুক্তি দরকার। যুবসমাজের বেকারত্ব দূর করতে যথাসাধ্য পদক্ষেপ গ্ৰহণ করে তাদের হতাশা দূর, সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের প্রতি সকলকে উদ্যোগী হতে হবে। ইতোমধ্যে যাদের আসক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে সোহাগে শাসনে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। দেশে যে সমস্ত নিরাময় কেন্দ্র আছে সাশ্রয়ী ফিতে চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করাসহ এলাকাভিত্তিক মাদক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি পরিবারে পিতা-মাতাকে আরও সচেতন হওয়া দরকার। পাড়া-প্রতিবেশীর সহযোগিতা নেওয়া এবং দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
দার্শনিক সেন্ট অগাস্টিন বলেছিলেন, ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়।’ তেমনি অবহেলা ও অপছন্দ করতে হবে মাদককে, মাদকাসক্তকে নয়। সুতরাং আজকে যে মাদকাসক্ত এবং বিপথগামী আগামীকাল সে পরিশুদ্ধ মানুষে পরিণত হতে পারে। ২৬ জুন বিশ্ব মাদক প্রতিরোধ দিবসেই শুধু নয়, প্রত্যেহ সবাই সচেতন থেকে মাদকাসক্তদের আমরা সুপথে নিয়ে আসব এই হোক সকলের প্রত্যাশা।
লেখক: নূরুদ্দীন দরজী (কলাম লেখক ও সাবেক শিক্ষা অফিসার )