হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি নানা কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ।
বিশেষ করে, এই মাসের দশম দিনটি ‘আশুরা’ হিসেবে মুসলিম উম্মাহর কাছে এক অনন্য ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে উপস্থিত হয়। আশুরা কেবল একটি বিশেষ দিন বা তিথি নয়, এটি মূলত অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের চিরন্তন বিজয়ের প্রতীক।
ইসলামের এই সুন্দর ও পবিত্র ইবাদতগুলোর বিপরীতে দুঃখজনকভাবে আশুরাকে কেন্দ্র করে সমাজে নানাবিধ অনৈসলামিক আচার-অনুষ্ঠান ও কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ইসলামের মূল আকিদা ও বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক এমনসব কর্মকাণ্ড পবিত্র আশুরার মূল চেতনাকে ম্লান করে দেয়। দ্বীনের ভেতর নতুন কোনো প্রথা তৈরি করা বা মনগড়া নিয়মকানুন প্রবর্তন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই আশুরার পবিত্রতা রক্ষার্থে সব ধরনের কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন প্রথা থেকে সমাজকে মুক্ত রাখা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব।
আশুরাকে কেন্দ্র করে শরিয়তবিরোধী বিভিন্ন বেদাত ও কুরআন-হাদিস বিরোধী কাজ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সঠিক ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে ইসলামের বিশুদ্ধ রূপটি বুকে ধারণ করতে হবে।
ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, আশুরার দিনটি সৃষ্টির শুরু থেকেই নানা ঐতিহাসিক ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী। এই দিনে মহান আল্লাহ তাআলা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এই দিনেই মানব ইতিহাসের দিকপরিবর্তনকারী বহু ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। হজরত আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল হওয়া থেকে শুরু করে হজরত নূহ (আ.)-এর কিশতি প্লাবন থেকে রক্ষা পাওয়া এবং হজরত মূসা (আ.)-এর অত্যাচারী ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার মতো কালজয়ী ঘটনাগুলো এই দিনটিকে করেছে অনন্য। তবে পরবর্তী সময়ে হিজরি ৬১ সনে কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর সপরিবারে শাহাদতবরণ এই দিনের তাৎপর্যকে এক গভীর বেদনাবিধুর ও ত্যাগের মহিমায় রূপান্তর করেছে।
পবিত্র আশুরার মূল চেতনা হলো আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্য, সত্যের পক্ষে অনড় অবস্থান এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করা। এই মহিমান্বিত দিনটি আমাদের শেখায় কীভাবে চরম বিপদের মুহূর্তেও ঈমানের ওপর অবিচল থাকতে হয়। একজন প্রকৃত মুমিনের জীবনে আশুরার আগমন ঘটে আত্মিক উন্নয়ন ও আধ্যাত্মিক চেতনাকে শানিত করার জন্য। তাই এই দিনের মূল সুর হওয়া উচিত ইবাদত, প্রার্থনা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রচেষ্টা।
ইসলামের চিরন্তন শিক্ষার আলোকে এই পবিত্র দিনের মহিমাকে অক্ষুণ্ন রাখতে হলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রিয় নবী (সা.)-এর সুন্নাতকে কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। আশুরার দিনটিতে অতিরিক্ত নফল ইবাদতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করাই মুমিনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনে রোজা রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী আম্বিয়া কেরামদের আমল থেকেও প্রমাণিত। এই সুন্নাহর যথাযথ অনুবর্তী হওয়াই আশুরার দিনটিকে উদযাপনের সর্বোত্তম মাধ্যম।
ইতিহাসের সেই মহান অধ্যায়গুলো থেকে আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে ধৈর্য ধারণের গভীর শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। বিপদে ধৈর্য হারানো মুমিনের কাজ নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পথে যেকোনো পরিস্থিতিকে দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করাই ইসলামের শিক্ষা। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রা.) যে চরম ধৈর্য ও সহনশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। নিজের জীবনের কঠিনতম মুহূর্তেও আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং ধৈর্য ধারণ করাই আশুরার প্রকৃত দীক্ষা।
পুরো মহররম মাস এবং বিশেষ করে আশুরার দিনে সার্বিক পবিত্রতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পোশাক-পরিচ্ছদ, বাসস্থান এবং মনের পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত পাওয়ার পথ সুগম হয়। অপবিত্র চিন্তা, হিংসা, বিদ্বেষ এবং পরনিন্দা থেকে নিজের জিহ্বা ও মনকে পবিত্র রাখতে হবে। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ এই দ্বিমুখী পবিত্রতাই মানুষকে প্রকৃত মানুষের মায়ায় এবং খোদার প্রেমে সিক্ত করতে পারে।
পবিত্র আশুরা আমাদের জন্য প্রতিবছর আত্মসংশোধন এবং ঈমানি চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করার এক মহান বার্তা নিয়ে আসে। ২০২৬ সালের এই পবিত্র ক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের দৃঢ় শপথ নিতে হবে যেন আমরা সব ধরনের কুসংস্কার, উচ্ছৃঙ্খলতা, মাতম ও বেদাতকে পুরোপুরি বর্জন করতে পারি। সুন্নাহর আলোয় জীবনকে সাজিয়ে, ইবাদত, রোজা, তাওবা ও মানবসেবার মাধ্যমে আশুরার গ্রহণীয় দিকগুলো ধারণ করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করে ইসলামের সঠিক পথে চলার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনই হোক আমাদের লক্ষ্য।
লেখক: ড. মো. আনোয়ার হোসেন (প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক)