প্রতীকী ছবি
হিজরি সনের প্রথম মাস মহরমের ১০ তারিখে প্রতি বছর পালিত হয়ে থাকে পবিত্র আশুরা। সমগ্র মুসলিম বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিনটি যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়ে থাকে।
দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রথম বাণী দিয়েছেন। দিনটি সরকারি ছুটির দিন।
আরবি ‘আশারা’ থেকে আশুরা শব্দের উৎপত্তিÑ যার অর্থ দশম। মহররম মাসের ১০ তারিখ মুসলমানদের জন্য নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণিত আছে এদিনে নবী মুসা (আ.) ফেরাউনের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কুদরতে সে সময় লোহিত সাগরের পানি বিভক্ত হয়ে সঙ্গীসহ মুসা (আ.)-কে পথ করে দিয়েছিল। আর মুসার পশ্চাধ্বাবনকারী ফেরাউন তার সৈন্য-সামন্তসহ ডুবে মরেছিল। হজরত মুসা (আ.)-এর এ বিজয়ের শুকরিয়াস্বরূপ মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা এদিনে রোজা পালন করে থাকেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী মহাপ্লাবনের পর নবী নুহ (আ.)-এর কিস্তি এদিন জুড়ি পাহাড়ের পাদদেশে ভিড়েছিল এবং অনুসারীগণসহ তিনি পুনরায় পৃথিবীর মাটিতে পা রেখেছিলেন।
তবে এসব ঐতিহাসিক ঘটনা ছাপিয়ে বিশ্ব ইতিহাসে ১০ মহরম একটি বেদনাদায়ক দিন হিসেবেই পরিগণিত। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের এদিনে কারবালা প্রান্তরে এক অসম যুদ্ধে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে পরাজিত ও শহীদ হন। কারবালার যুদ্ধ ছিল চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও শঠতাপূর্ণ। হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পরে ইসলামের খেলাফত নিয়ে যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত, তারই নির্মম শিকার হয়েছিলেন ইমাম হোসাইন ও তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ। খেলাফতের মসনদকে নিষ্কণ্টক করতে খলিফা মুয়াবিয়াপুত্র ইয়াজিদ যে চক্রান্তের জাল পেতেছিল, পবিত্র মনের অধিকারী নবী দৌহিত্র হোসাইন তাতে পা দিয়েছিলেন। তিনি ইয়াজিদের অপশাসন ও লাম্পট্যের বিরুদ্ধে তরবারি ধারণ করতে মনস্থ করেন এবং মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশে রওনা হন। মাত্র ৭০ জন সহযাত্রী নিয়ে ইমাম হোসাইন যখন কুফায় আগমন করেন, তখন সেখানকার অধিবাসীর তাকে স্বাগত জানায় এবং খলিফা হিসেবে তাকে সমর্থন জানায়। কারণ তারা ইয়াজিদের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ ছিল। কুফা থেকে কিছুটা দূরে এগোতেই ইয়াজিদ বাহিনী তার গতিরোধ করে এবং পুনরায় উত্তর দিকে সরে যেতে বাধ্য করে। এমতাবস্থায় ইমাম হোসাইনের কাফেলা কারবালার সমভূমিতে শিবির স্থাপন করে। অল্প সময়ের মধ্যেই ৪ হাজারেরও বেশি সৈন্য সংবলিত ইয়াজিদের এক বিশাল বাহিনী সেখানে এসে উপস্থিত হয় এবং হোসাইনের কাফেলাকে ঘেরাও করে ফেলে। তারা ফোরাত নদী (ইফ্রেতিস) ঘিরে ফেলে এবং ইমামের কাফেলাকে পানি সংগ্রহে বাধা দেয়। এভাবে ঘেরাও থেকে পিপাসায় কাতর ইমাম হোসাইনের পুরুষ সঙ্গীরা ইয়াজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে একে একে শহীদ হন। ১০ মহরম ইমাম হোসাইন স্বয়ং যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হন এবং ইয়াজিদের সেনাপতি সীমারের হাতে নিহত হন।
কারবালা যুদ্ধের ঘটনাকে কোনো কেনো ঐতিহাসিক ইসলামের খেলাফত তথা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের লড়াই হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস পান। ইদানীং কোনো কোনো ইতিহাস লেখক ইয়াজিদকে মহান শাসক হিসেবে তুলে ধরতেও চেষ্টা করেন। তারা যে নিতান্তই ভ্রান্ত সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইসলামের খেলাফতের দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় কারবালার যুদ্ধ সংঘটিত হলেও তা ছিল এক স্বৈরাচারী শাসকের অন্যায়, অবিচার, দুঃশাসন ও লাম্পট্যের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের যুদ্ধ। সে লড়াই ছিল নির্যাতনের কবল থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে। অমানবিকতার শেকল ছিন্ন করে মানবিকতার মুক্তি ছিল সে যুদ্ধের অন্যতম অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।
আর সেজন্যই শত শত বছর পরেও ১০ মহরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন ও তদীয় সঙ্গীদের আত্মোৎসর্গের নিদর্শন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে। ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল ১০ মহরম তথা পবিত্র আশুরা তাই আজও দেদীপ্যমান। মানুষ এবং ইসলাম ধর্মের অনুসারী হিসেবে আমাদের কর্তব্য পবিত্র আশুরার শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে সমস্ত অন্যায়-অবিচারকে রুখে দাঁড়ানো।
সম্পাদকীয়