সাঈদ বারী
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বিদেশ সফর শুরু করেছেন মালয়েশিয়া দিয়ে।
কূটনৈতিক বিচারে এটি হয়তো একটি স্বাভাবিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র এবং বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে মালয়েশিয়ার গুরুত্ব অনেক। তবে এ সফরের একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে বিস্ময়কর কিছু সাদৃশ্য রয়েছে।
এ দুই নেতার রাজনৈতিক যাত্রা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাজনীতিতে সময় কখনও সরলরৈখিক নয়। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি কিংবা জনসমর্থনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য, টিকে থাকার সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের দক্ষতা।
আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে একসময় ছিলেন উজ্জ্বল সম্ভাবনার প্রতীক। তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে প্রায় অবধারিত মনে করা হতো। কিন্তু অনিবার্য কারণে তার জীবনে নেমে আসে এক কঠিন, অন্ধকারময় অধ্যায়। দুর্নতির অভিযোগে তিনি বরখাস্ত হন, কারাবরণ করেন এবং দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পর জনগণের সমর্থন নিয়ে তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসেন এবং শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা ভিন্ন বাস্তবতায় হলেও একই ধরনের দীর্ঘ পথচলার সাক্ষ্য বহন করে। ক্ষমতা-কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান করলেও তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন কখনও সরলরৈখিক ছিল না। রাজনৈতিক বিরোধীদের সুপরিকল্পিত অপপ্রচার, কিছু গণমাধ্যমের নেতিবাচক বয়ান এবং ওয়ান-ইলেভেনের সময়কার রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, মামলা ও কারাবাস তার রাজনৈতিক পথচলাকে প্রতিকূলতার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। যে কারণে তিনি দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন। জনসমর্থন, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সময়ের পরিবর্তন বহু অসম্ভবকেও সম্ভব করে তোলে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করে এ বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়াকে প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া নিছক একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়েও বেশি কিছু বলে মনে হয়। এটি যেন দুই দেশের দুই দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীকী সংযোগ। অবশ্যই বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। দুই দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, ইতিহাস, সামাজিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। তাই দুই নেতাকে সম্পূর্ণ অভিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে নতুন অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় দুই দেশের সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রতীকী সাদৃশ্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা। কারণ রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সাফল্যের শেষ কথা নয়; বরং সেটি নতুন দায়িত্বের শুরু।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা। একজন নেতা কতটা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি ক্ষমতায় গিয়ে কেমন রাষ্ট্র নির্মাণ করেন। অতীতের কষ্ট ভবিষ্যতের প্রজ্ঞায় রূপান্তরিত হলেই কেবল সেই সংগ্রাম অর্থবহ হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে দেখলে, তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের এই প্রতীকী মিলন আমাদের সামনে একটি বড় শিক্ষা তুলে ধরে।
রাজনীতিতে কোনো যাত্রাই সরল নয়। উত্থান আছে, পতন আছে, নির্বাসন আছে, প্রত্যাবর্তনও আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা অর্জন এবং সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করাই একজন নেতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর তাই শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়; এটি একই সঙ্গে দুই সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনের এক প্রতীকী সংযোগও।
লেখক: সাঈদ বারী (প্রকাশক ও কলাম লেখক)