নিকুঞ্জ-২। ছবি: ফাইল ছবি
বাঙালি জাতির ইতিহাসে ভূমি অধিগ্রহণ মানেই সাধারণ মানুষের ভিটেমাটিচ্যুত হয়ে উদ্বাস্তু হওয়া এবং চিরতরে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার এক নির্মম উপাখ্যান। যখনই যেখানে উন্নয়ন বা অন্য কোনো প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, সেখানেই মানুষ তার পূর্বপুরুষের স্মৃতি, উপার্জনের উৎস এবং মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে পথে বসেছে।
এই নির্মম বাস্তবতার এক জলজ্যান্ত ও দীর্ঘস্থায়ী উদাহরণ ঢাকার খিলক্ষেত থানাধীন জোয়ার সাহারা মৌজার নিকুঞ্জ-২ সংলগ্ন টানপাড়া এলাকা। এই অঞ্চলের মানুষ একবার নয়, একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে ভূমি হারিয়ে স্থানচ্যুত হয়েছে। আজ পাকিস্তান আমলের সেই পুরনো ক্ষতের ওপর নতুন করে চেপে বসেছে আধুনিক আমলাতন্ত্র ও দুর্নীতির এক অদৃশ্য পাহাড়।
টানপাড়ার এই ভূমি জটিলতার কালো মেঘের সূত্রপাত তৎকালীন পাকিস্তান আমলে। ১৯৬১-৬২ সালে ভূমি অধিগ্রহণ মামলা নম্বর ১৩৮/৬১-৬২ এর আওতায় জোয়ার সাহারা মৌজার বিস্তীর্ণ এলাকা তৎকালীন ‘ডিআইটি’ (বর্তমান রাজউক) ও অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন সময়ে কোনো ধরনের জনমত বা মানবিক দিক বিবেচনা না করেই হাজার হাজার মানুষকে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। তবে এক অদ্ভুত প্রশাসনিক অসঙ্গতির কারণে, সংশ্লিষ্ট এলাকার বহু জমির বাস্তব দখল সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা কোনোদিন গ্রহণ করেনি। অনেক আদি মালিক কোনোদিন ক্ষতিপূরণের একটি টাকাও চোখে দেখেননি। ফলে উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলোর একাংশ নিরুপায় হয়ে পৈতৃক ভূমির মায়া ছাড়তে না পেরে বংশপরম্পরায় ওই জমিতেই বসবাস করতে থাকেন। কাঁচা ঘর থেকে কালক্রমে মাথা গোঁজার জন্য পাকা ও আধা-পাকা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেন।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক ধরে টানপাড়ার মানুষ আইনি লড়াই, প্রশাসনিক কার্যালয়ে দৌড়ঝাঁপ এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যান। এই দীর্ঘ সময়ে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্তাদের অনীহা, নথিপত্রের গায়েব হয়ে যাওয়া এবং নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চক্করে টানপাড়ার সাধারণ নাগরিকদের বারবার নিগৃহীত হতে হয়েছে।
অবশেষে ২০১৭ সালের ২২ জুন তাদের জীবনে আনন্দের জোয়ার এসেছিল। ভূমি মন্ত্রণালয় এক ঐতিহাসিক সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে ১৩৮৫ দশমিক ২৮ একর ভূমি মূল মালিকদের অনুকূলে অবমুক্ত ঘোষণা করে। সরকারি শর্ত অনুসারে, ভূমি মালিকরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ নির্ধারিত চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেন। এরপর ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধিগ্রহণ শাখা থেকে প্রতিটি জমির বিপরীতে আলাদা আলাদা ‘অনাপত্তি সনদ’ সংগ্রহ করেন। এখানেই শেষ নয়; সরকারের সর্বশেষ ভূমি রেকর্ড তথা ঢাকা মহানগর জরিপে এই জমিগুলো সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষে সংশ্লিষ্ট মালিকদের নামে চূড়ান্তভাবে খতিয়ানভুক্ত ও রেকর্ডভুক্ত হয়।
আইনানুযায়ী মহানগর জরিপ চূড়ান্ত হওয়ার পর একজন নাগরিকের নামজারি এবং খাজনা দেওয়া তার মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু টানপাড়ার মানুষের ভাগ্যে ঘটল উল্টোটা। সব বৈধ কাগজ থাকার পরও হঠাৎ করেই খিলক্ষেত সার্কেলের ভূমি কার্যালয় থেকে টানপাড়ার জমির ই-নামজারি ও খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারি কার্যালয়ে গেলে এক লাইনের মুখস্থ উত্তর দেওয়া হয়Ñ ‘ওপরের নির্দেশ আছে, টানপাড়ার জমির নথি স্থগিত রাখা হয়েছে।’ আইনে যদি বাধা থাকে, তবে অতিরিক্ত লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিলে সেই আইন বা নিষেধাজ্ঞা কোথায় উবে যায়? পর্দার আড়ালে নির্দিষ্ট কিছু দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের চুক্তি করলে অসম্ভব কাজও জাদুকরীভাবে সম্ভব হয়ে যাচ্ছে।
টানপাড়ার বাসিন্দাদের এই দুর্ভোগ কেবল ভূমি কার্যালয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের জটিলতাও। ঢাকা শহরের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো নতুন ভবন নির্মাণ বা সংস্কার করতে গেলে রাজউকের ‘ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র’ ও ‘নকশা অনুমোদন’ বাধ্যতামূলক। আর এই অনুমোদনের জন্য প্রধান শর্তই হলো হালনাগাদ খাজনার রসিদ ও নামজারি খতিয়ান। যেহেতু ভূমি কার্যালয় এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, তাই রাজউক থেকেও কোনো ভবনের অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বৈধভাবে ঘর তোলার সব পথ বন্ধ। এই কারণে বহুতল ভবন তো দূরের কথা, কোনো জরাজীর্ণ পৈতৃক বাসস্থান ভেঙে নতুন করে দুটি ঘর তোলার মতো স্বাভাবিক সুযোগও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
টানপাড়ার মানুষ রাষ্ট্রের কাছে কোনো দয়া বা অনুগ্রহ ভিক্ষা চাচ্ছে না। তারা শুধু রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং দেশের প্রচলিত আইনে তাদের যে অধিকার, সেটির বাস্তব বাস্তবায়ন দেখতে চায়। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে ভূমি মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করল, সরকারের সর্বোচ্চ জেলা প্রশাসন অনাপত্তি সনদ দিল, সরকারেরই জরিপ অধিদপ্তর মহানগর জরিপে চূড়ান্ত রেকর্ড দিল- সবুজ সংকেতের আর কি বাকি আছে? এরপরও যদি মাঠ পর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা সাধারণ মানুষকে নামজারি করতে না দেয়, খাজনা না নেয়, তবে বুঝতে হবেসরকারি প্রশাসনের ভেতরেই একদল অর্থলোভী শকুন সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফায়দা লুটছে।
আমাদের সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর এবং অন্য কোনোভাবে তা নিষ্পত্তি করার অধিকার থাকবে। কিন্তু খিলক্ষেত ভূমি কার্যালয় যেন সংবিধানের এই মৌলিক ধারাকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। টানপাড়ার বাসিন্দারা তাদের বৈধ অর্জনের বা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি না পারছেন হস্তান্তর করতে, না পারছেন ব্যবহার করতে। এই আচরণের অর্থ হলো একজন মানুষের নাগরিক অধিকারকে অস্বীকার করা।
ভূমি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মুখে ‘আধুনিক বাংলাদেশ’ ও ‘উন্নত ভূমি সেবা’র বুলি আওড়ালেও মাঠ পর্যায়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়গুলোতে নামজারির নামে সাধারণ মানুষকে মাসের পর মাস ঘোরানো হচ্ছে। নথির গায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি ত্রুটি দেখাতে না পেরে শুধু ‘স্থগিত’ বা ‘নথিভুক্ত নয়’ লিখে রাখা হয়। এই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও স্বচ্ছতার অভাব সরাসরি নাগরিক হয়রানি এবং দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী।
একই মৌজায়, একই দাগের জমির ক্ষেত্রে দুই ধরনের আইন দেখা যাচ্ছে। একজন সাধারণ সৎ নাগরিককে বলা হচ্ছে আইনগত জটিলতার কারণে কাজ হবে না, অথচ তার পাশের প্লটের লোক প্রভাব খাটিয়ে বা লাখ লাখ টাকা লেনদেন করে কাজ ঠিকই বাগিয়ে নিচ্ছে। এই বৈষম্য ন্যায় বিচার ও সমতার বাংলাদেশ চেতনার পরিপন্থী।
দেশের প্রায় সব এলাকায় ভূমি কার্যালয়কে ঘিরে সাধারণ মানুষের হয়রানি ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু খিলক্ষেত টানপাড়ার ঘটনাটি দেশের সমগ্র ভূমি প্রশাসনের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ও ন্যাক্কারজনক নজির। বলাটা অত্যুক্তি হবেনা, এটি এখন আর কেবল একটি এলাকার সমস্যা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর মস্ত বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন খাড়া করেছে। যদি ঢাকার বুকেই সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং খোদ জেলা প্রশাসনের অনাপত্তি সনদকে মাঠ পর্যায়ের কেরানি বা কর্মকর্তারা অবজ্ঞা করতে পারেন, তবে প্রান্তিক অঞ্চলের অবস্থা কেমন, তা ব্যাখ্যা করে বলার দরকার পড়ে না।
একটি স্বাধীন দেশে সরকারি গেজেট, অনাপত্তি সনদ এবং চূড়ান্ত ভূমি রেকর্ড থাকার পরও যদি একজন নাগরিক নিজের জমির খাজনা দিতে না পারেন, তবে সেজন্য দায়ি কারা? তাই টানপাড়ার বাসিন্দাদের প্রশ্ন- রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দেওয়া সব শর্ত অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করার পরও কোন অদৃশ্য শক্তির কারসাজিতে তারা মৌলিক ভূমি সেবা থেকে বঞ্চিত? আর যদি নিয়মের বেড়াজালে সবকিছু বন্ধই থাকে, তাহলে পর্দার আড়ালে টাকার বিনিময়ে কিছু কাজ কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে?
এই দুই প্রশ্নের উত্তর সততার সঙ্গে ও নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান এখন রাষ্ট্র তথা ভূমি মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব। টানপাড়াবাসীর প্রশ্ন- এ বিষয়ে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ কী তারা আশা করতে পারেন?
লেখক: জাহিদ ইকবাল (সাংবাদিক ও কলাম লেখক, আহ্বায়ক, নিকুঞ্জ-টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি)