প্রতীকী ছবি
হাম ও ডেঙ্গুর দ্বিমুখী বিপর্যয়ে জনস্বাস্থ্য কার্যত এক সংকটময় পরিস্থিতিতে। একই সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব ও ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। হামে প্রতিদিনই রোগী মারা যাচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যাও থেমে নেই।
সমানতালে চলছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপও। সহজ করে বললে, এই দুই রোগের একযোগে বিস্তার দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতি যেন জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে ধীরগতি এবং বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বংশবৃদ্ধিÑ উভয় সংকট নিরসনে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ এখন জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর (গত মঙ্গলবার পর্যন্ত) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৫ হাজার ১৬০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। প্রাণ হারিয়েছে ১০ জন। একই সময়ে হামে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৯৪ হাজার ৭৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে; যার মধ্যে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ২৯৭ জন। সর্বশেষ হাম সন্দেহে ৫৯৩ জন, নিশ্চিত হামে ৯৩ জন মারা গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হাম ও ডেঙ্গুর এই দ্বিমুখী প্রকোপে দেশে জটিল জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে সামনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘হাম ও ডেঙ্গু জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এখনই কমিউনিটি পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা, তাদের পৃথকভাবে যত্ন নেওয়া এবং সেকেন্ডারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’
উল্লেখ করা প্রয়োজন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। শিশুদের মধ্যে এর সংক্রমণ বেশি দেখা গেলেও টিকা না নেওয়া যেকোনো বয়সী মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় দীর্ঘদিন ধরে হাম নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় রোগটির প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, টিকাদানের আওতার বাইরে থেকে যাওয়া শিশু, অভিভাবকদের উদাসীনতা এবং কিছু ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের প্রভাব। পরিসংখ্যান বলছে, হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার প্রধান কারণ দেশের সবখানে ৯৫ শতাংশ টিকাদান নিশ্চিত না হওয়া। যদিও জাতীয় পর্যায়ে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের কভারেজ ১০৩ শতাংশ দেখানো হয়েছে, কিন্তু অনেক জায়গায় মাইক্রো-প্ল্যান সঠিক হয়নি। কিছু শিশু বাদ পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা না দেওয়া হলে হামের প্রকোপ কমানো সম্ভব হবে না এবং এর প্রাদুর্ভাব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে ডেঙ্গু এখন মৌসুমি গণ্ডি পেরিয়ে সারা বছরের ব্যাধির রূপ নিয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও জেলা থেকে প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ডেঙ্গুর জটিল রূপ, বিশেষ করে ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর ও শক সিনড্রোম, দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী হতে পারে। বলা হচ্ছে, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সরকারের কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করতে সম্প্রতি জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বাধীন এ কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। তারা বলছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা। হাম প্রতিরোধের প্রধান উপায় শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে বিশেষ টিকাদান অভিযান পরিচালনা করার বিকল্প নেই। যেসব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়নি, তাদের দ্রুত টিকাদান কার্যক্রমের আওতায় আনতে হবে।
অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং সাধারণ নাগরিকদেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নির্মাণাধীন ভবন ও জলাবদ্ধ স্থানের তদারকি এবং কার্যকর মশক নিধন কর্মসূচি বাস্তবায়ন ছাড়া ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করা কঠিন। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর উপসর্গ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো দরকার। সবচেয়ে বেশি জরুরি, সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং রোগতাত্ত্বিক নজরদারি বাড়ানো।
বস্তুত হাম ও ডেঙ্গুর চলমান প্রকোপ আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দুটো রোগের সংক্রমণই অবহেলা, অসচেতনতা, সময়মতো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করার ফলে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, জনসচেতনতা সৃষ্টি, টিকাদান কর্মসূচির জোরদার বাস্তবায়ন এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমেই এই দ্বৈত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারের নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ ও কার্যকর পদক্ষেপ। মৌখিক নয়, মৌলিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবস্থা গ্রহণই এ সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায়।