প্রতীকী ছবি
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু নিখোঁজ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। সে সঙ্গে বাড়ছে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
এ ধরনের অপরাধের ভয়াবহতায় সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। শিশুরা একটি দেশের ভবিষ্যৎ, জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু প্রায়শই সংবাদ মাধ্যমে শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা রহস্যজনক কারণে মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা, সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে তুলে ধরছে।
মঙ্গলবার প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গত কয়েক দিনে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ঝিনাইদহে পৃথক ঘটনায় শিশুদের নিখোঁজের পর লাশ উদ্ধার, আবার কোথাও নির্যাতনের পর জীবিত উদ্ধারের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। ওইসব এলাকায় চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিটি ঘটনারই পৃথক তদন্ত চলছে। টাঙ্গাইলের সখীপুরে নিখোঁজের দুই দিন পর সেঁজুতি নামে এক শিশুর মরদেহ মিলেছে পুকুরে। সে সখীপুর আদর্শ শিশু কানন প্রি-ক্যাডেট স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের দাবি, অপহরণের পর সেঁজুতিকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। মানিকগঞ্জের সিংগাইরে নিখোঁজের ছয় দিন পর মারিয়া মাহি নামের এক স্কুলছাত্রীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আটজনকে আটক করেছে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে নিখোঁজের চার দিন পর দেড় বছরের শিশু মায়শার মরদেহ পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, পূর্বশত্রুতার জেরে তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ৯ বছরের শিশুকে অপহরণের পর নির্যাতন করে মৃত ভেবে কচুরিপানার নিচে চাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, সোমবার সকালে শিশুটি বাড়ির পাশে খেলছিল। এ সময় তাকে অপহরণ করা হয়। স্থানীয় দুই শিশুর সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রতিটি ঘটনা এতটাই নির্মম ও অমানবিক যে, আমাদের আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।ঁ
বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) নানা সহিংসতায় ১১৫ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত পহেলা জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। এ পরিসংখ্যান একটি স্বাভাবিক সমাজের চিত্র হতে পারে না।
শিশু খুনের ঘটনাগুলো যে রোমহর্ষক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেনো কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের পরিবার মাসের পর মাস সন্ধান পায় না। কখনও মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, কখনও মানবপাচার, আবার কখনও বিভিন্ন অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ে শিশুরা হারিয়ে যাচ্ছে। এভাবে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা সচেতন সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। এমনকি পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত ব্যক্তির হাতেও শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, যা সামাজিক নিরাপত্তার চরম সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের পেছনে পারিবারিক অসচেতনতা, সামাজিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করছেন সচেতন মহল। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের একা চলাফেরা, অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা পর্যাপ্ত তদারকির অভাব তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। অন্যদিকে, অপরাধীরা অনেক সময় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, যা নতুন করে একই অপরাধকর্মে তাদের সাহস জোগাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করা অবশ্যক। শিশু সুরক্ষা আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে পরিস্থিতির উন্নতির আশা কম। সে সঙ্গে অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি থানায় শিশু নিখোঁজ সংক্রান্ত অভিযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে শিশু নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সন্তানদের প্রতি আরও যত্নশীল ও সতর্ক হতে হবে। প্রযুক্তির এই যুগে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, জাতীয় ডেটাবেজ এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে শিশু সুরক্ষার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের নয়, এটি পুরো সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। যে সমাজ শিশুকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে সমাজকে সভ্য সমাজ বলা যায় না। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় বলেছেনÑ ‘এ পৃথিবীকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ কবির সে অঙ্গীকার কি রক্ষা করতে পারছি? যেদিন এদেশে একটি শিশুও নির্যাতনের শিকার হবে না, নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে না, নির্যাতিত শিশুর আর্তনাদ যেদিন আর শোনা যাবে না, সেদিনই আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারব, কবি সুকান্তের করা অঙ্গীকার রক্ষা করতে পেরেছি। সেদিনই শিশুদের জন্য বাসযোগ্য হবে এ সমাজ।
সম্পাদকীয়