ড. বদিউজ্জামান
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্যের ছাত্র কিন্তু সরাসরি সাহিত্য বিষয়ে তার রচনার সংখ্যা বেশি নেই। এমনকি সাহিত্য বিষয়ে তার রচনাও গতানুগতিক সমালোচনা সাহিত্যের প্রথাদাসত্ব অতিক্রম করে গদ্যসাহিত্যে বা প্রবন্ধ সাহিত্যে রূপ নিয়েছে। কবিতার তুলনায় গদ্য রচনার ভুবন অপেক্ষাকৃত বিশাল ও দিগন্তবিস্তারী। ফলে গদ্য রচনার অর্থই যেমন সাহিত্য নয়, তেমনি সকল গদ্য রচনাই সাহিত্য পদবাচ্য নয় সে বিষয় নিশ্চিত।
কবিতা রচনা সাহিত্য সৃষ্টির অন্তর্গত, তবে মান সম্পর্কে ব্যতিক্রম অনেক। কিন্তু গদ্যরচনা এর তুলনায় আমূল পৃথক। কোনো কোনো গদ্যরচনা সাহিত্য কিন্তু সকল গদ্যরচনা সাহিত্য নয়। যেসব গদ্যরচনা সাহিত্য সেখানেও কবিতার অনুরূপ মানের ব্যতিক্রম অনেক। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্যরচনার ক্ষেত্রে এটা অনেক বেশি উল্লেখযোগ্য এ কারণে যে, তার অধিকাংশ লেখা সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সম্পর্কযুক্ত, এখানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর হাতে যা উচ্চমানের সাহিত্য হয়েছে, অপর কোনো দুর্বল ক্ষমতাহীন লেখকের হাতে তা কখনও সাংবাদিকতা, পাঠ্যপুস্তক, গতানুগতিক সমালোচনা গ্রন্থ, বিষয়ভিত্তিক নোট বই হয়ে উঠতে পারে, প্রকৃতপক্ষে হয়েছেও সেভাবে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ব্যতিক্রম এখানেও এবং এজন্য যে, তার বক্তব্যগুলো মৌলিক, সৃষ্টিশীল, প্রকাশশৈলী উচ্চমানের শৈল্পিকমণ্ডিত, অবশ্যম্ভাবী নিজস্বরূপে, এরূপ দ্বিতীয় আর কোনো দৃষ্টান্ত এখানে নেই, এখনও নেই। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্রাটের মতো তার নিজস্ব ভুবনে, তার এ অবস্থান এবং অর্জন এখনও বিকল্পহীন।
দৃশ্যত কোনো বিষয়বস্তু এবং তা নিয়ে লেখা যেখান থেকেই শুরু হোক না কেন বিভিন্ন মাত্রায় সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সেসবের সঙ্গে ক্রমেই এসে যুক্ত হয়, সকল বিষয়ের মিলিতরূপে তা এক ধরনের মৌলিকত্বপ্রাপ্ত হয়, সেভাবে তুলনাহীন অনিন্দ্য উপসংহারও সৃষ্টি করে তোলে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনায় সমাজ গুরুত্ব পেয়েছে তা ঠিক, তবে সমাজ প্রসঙ্গের কথা বলা হচ্ছে আসলে একে প্রকাশ করার জন্য এবং পাঠকের উপলব্ধির সুবিধার জন্য। প্রকৃতপক্ষে তার লেখাগুলো আর্থ-সামাজিক এক প্রকার চিন্তাভুবনের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়, কোনো প্রকার পারিভাষিকতা দেওয়ার জন্যই একে সমাজ বলা হচ্ছে। বিশেষ অর্থে, তা হলো ইহজাগতিক মানুষের কথা, এ মানুষ একাকী নিঃসঙ্গ বাস করে না বলে বিভিন্ন মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ মানুষের বিকাশ সম্পূর্ণতা পায়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনায় এভাবে মানুষ এসেছে, ইহজাগতিক মানুষ এসেছে এবং মানুষের কথাই প্রধান হয়েছে বলে তাকে একত্রে সে মানুষের বিকাশের ক্ষেত্র সমাজের কথা বলা হচ্ছে। এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত প্রসঙ্গ হলো সংস্কৃতি, এ সমাজ যেমন এ ইহজাগতিক মানুষের অস্তিত্বের প্রকাশ, তেমনি এ সংস্কৃতিও হলো সেরূপ সামাজিক মানুষের ইহজাগতিক আত্মপ্রকাশের কথা, পারস্পরিক সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়ার কথা, একত্রে।
সুতরাং ইহজাগতিক মানুষ আছে বলে সমাজ আছে সমাজ আছে বলে সংস্কৃতি এসেছে, এ সমাজ ও সংস্কৃতি হলো ইহজাগতিক সামাজিক মানুষের সামগ্রিক আত্মপ্রকাশের কথা, সম্মিলিতভাবেই। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনায় এর পরেই নিবিড়ভাবে আসে রাজনীতির কথা, একমাত্র তার লেখাতেই রাজনীতির তাত্ত্বিকতা পূর্ণ সমগ্রতা নিয়ে এভাবে এসেছে। সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে এরূপ মিলিত দৃষ্টান্ত আর নেই, তার মতো করে আর যে নেই তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তার রচনায় রাজনীতির একটি বিশেষায়িত দিক আছে, যা অন্য কারও সঙ্গে মেলে না, প্রকৃতই মেলে না। সাধারণভাবে রাজনীতির ভুবনটি বেশ বড়। সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতির সকল ভুবনই অত্যন্ত বড়, তবে রাজনীতির কথাগুলো হয়তো আরেকটু বড় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নিজের মতো করে নিয়ে। এক হিসেবে রাজনীতি হলো অনেকটা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জীবনকেন্দ্রিক, তাদের নিবিড় উপলব্ধিকেন্দ্রিক, সেখান থেকে প্রসারিত হয়ে সমাজ ও জীবনের বিভিন্ন প্রান্তিকে পৌঁছে যায়।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখায় রাজনীত হলো তার উপলব্ধিকৃত সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে, এর ফলে তার পূর্ণ উপলব্ধি ভুবনের সঙ্গে তা যুক্ত হয়ে তার ঈপ্সিত মানুষের নিকট, আরও বিশেষায়িতরূপে প্রলেতারীয় মানুষের নিকট পৌঁছে যায়। সে অর্থে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সমগ্র সৃষ্টিকর্মে রাজনীতির বাণীরূপ আসলে প্রলেতারীয় মানুষের জন্য এবং মার্কসীয় শ্রেণিসংঘাতের বা শ্রেণিদ্বন্দ্বের ওপর ভিত্তি করে মানুষের বিজয়ের কথা সেখানে আছে। এ মানুষ কোথাও কখনও ধর্ম, বর্ণ, ভাষা এবং অন্য কোনো সীমাবদ্ধতার মধ্যে বন্দি হয়ে নেই। মানুষের বিজয়ের কথা, বিজয়ের আশাবাদ সেখানে আছে এ কারণে তার রচনায় কখনও নৈরাশ্য নেই, ব্যক্তিগত জীবনের চূড়ান্ত দুঃখের দিনের দুঃখের কথার মধ্যেও কখনও তার আশাবাদ নিঃশেষিত হয়ে যায়নি। ট্র্যাডিশনাল রাজনীতিকথার এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিকতার সঙ্গে এগুলো মিলবে না। এ কারণে কখনও কারও কাছে তা হয়তো ইউটোপীয় বলে মনে হয়েও থাকতে পারে। কিন্তু প্রকৃতই তা নির্বস্তুক অসম্ভবতার মধ্যে নিঃশেষিত হয়ে যায় না, কখনও হতাশা একে আচ্ছন্ন করে না কিংবা ঢেকে দেয় না।
এগুলো তার গভীরমূল বিশ্বাস এবং উপলব্ধির অন্তর্গত এখানেও যে তিনি সমকালীন কোনো প্রথাবদ্ধ রাজনীতির এবং অন্যান্য মঞ্চে নিজেকে বিলীন করে দেননি। নিজস্ব কিছু অপরূপ বৈশিষ্ট্য কিংবা ব্যতিক্রম সর্বত্রই বিদ্যমান রেখেছেন। এ কারণেও রাজনীতির বিভিন্ন টানাপড়েনের মধ্যে, সুযোগ সুবিধার বিকিকিনির মধ্যে তাকে কোথাও কখনও পাওয়া যায়নি, এরূপ ব্যতিক্রম এখানেও হয়তো বিরল, হয়তো আর নেইও। সামগ্রিকভাবে এগুলো আরও লক্ষণীয় ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এ কারণে যে এরূপ ব্যতিক্রম এখানে আমাদের সময়ে ও পরিমণ্ডলের মধ্যে আর পাওয়া যায়নি। তার এ রাজনীতিকথা হলো অবশ্যম্ভাবীরূপেই এখানকার প্রলেতারীয় মানুষের একত্রে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নিজস্ব উপলব্ধির ভুবনে জন্ম ও বিকাশপ্রাপ্ত, কখনও তার এ ঈপ্সিত সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি একত্রে এদেশের মাটিতে প্রায়োগিকতা পেলে, যদি পায় কখনও, তা হবে সমগ্র ইতিহাসের পটভূমিতে চিরকালীন স্মৃতিতে ধারণ করে রাখার মতো।
তিনি তার এ উপলব্ধির সমগ্রতা থেকে কখনও যে সরে যাননি এতে তার গভীর আস্থা ও আত্মপ্রত্যয়ের দৃষ্টান্ত মেলে। সুতরাং সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উপলব্ধির ভুবন তার নিজস্ব, কেবল যে সমকালীন মানুষকে তিনি কিছু দিয়ে গেলেন তাই নয়। এ কথা বিশ্বাস করতে খুবই আগ্রহ জন্মে যে, একদিন এরূপ ভুবনের সমগ্রতার মধ্যেই এ মানুষের আত্মসাক্ষাৎকার ও আত্মজাগরণ ঘটবে। সমাজ সংস্কৃতি ও রাজনীতির এ মিলিতরূপের মধ্যে আছে এ ভুবনের পূর্ণ উত্তরাধিকার, বাঙালি মানুষের, হয়তো পূর্ব বাংলার, একালের বাংলাদেশের মানুষের বেশি করে, হয়তো সম্পূর্ণরূপেই। সুতরাং এদেশের মাটিতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আছেন এবং থাকবেন, তার মতো এরূপ বিরল দৃষ্টান্তময় উপস্থিতি আর হয়তো নেই। তার সমগ্র লেখার ভুবনকে সামনে নিলে এখানকার কথাগুলো নিয়ে আরও অনেক অনেক অগ্রসর হয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে, সেখানে থেকে আরও বহুমাত্রিক বর্ণময় ভুবনে উপনীত হওয়ার সুযোগও বিস্তর রয়েছে, কোনো সম্ভাবনাময় গবেষক হয়তো এভাবে কোনো নতুন পৃথিবীর নিকট পৌঁছতে আগ্রহী হবেন। কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা এখানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনারীতি কিংবা প্রকাশশৈলী বিষয়ে কিছু কথা নিয়ে এসে আপাতত শেষ করতে চাই।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনারীতি তার সমগ্র বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এবং তার মতো করেই, এরূপ আর নেই। তার রচনারীতির মধ্যে নতুন নতুন বর্ণ সংযুক্ত হয়েছে অনেক, বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, রচনারীতি নিয়ে তার বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্যে কখনও ছন্দপতন হয়নি। তার রচনারীতির দুটো দিক, এক. শব্দের ব্যবহার, দুই. বাক্যের গঠন দুয়ে মিলে পূর্ণতার দিকে নিয়ে এক অপরূপ ভুবন গড়ে তোলে। তার ব্যবহৃত শব্দ ট্র্যাডিশনাল কিন্তু সেসবের ব্যবহার কিংবা প্রায়োগিকতা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভুবন থেকে, এখানেই তার অপরূপ বৈশিষ্ট্য এবং অন্যের সঙ্গে তার মিল নেই। এ পর্যন্ত বাংলা ভাষার ব্যবহৃত এবং ব্যবহৃত একই শব্দ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর হাতে তার ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে এবং তার নিজস্ব ভুবনে এসে কী সমৃদ্ধ হতে পারে তা এখানে, তার প্রায় সকল রচনাতেই পাওয়া যাবে। এখানেই লক্ষ করা যাবে, বাংলা ভাষার চিরাচরিত একই শব্দ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর হাতে এসে কীভাবে তার নিজস্ব হয়ে উঠতে পারে কীভাবে তার ভুবন গড়ে তুলে ব্যক্তিত্বের প্রকাশরূপ সৃষ্টি করেও তুলতে পারে তা এখানে পাওয়া যাবে। তার ব্যবহৃত শব্দ বাক্যগঠন তার নিজস্ব, দুয়ে মিলে তার এ নিজস্বতা, অন্য কারও নয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পূর্ণ একক তার নিজস্ব ভুবনে, তার কোনো বিকল্প নেই, তিনি অদ্বিতীয় ব্যতিক্রমী নক্ষত্র এখানেও। তার বাক্যগঠন ও বাংলা শব্দের ব্যবহার একত্রে মিলেই, এরূপ সম্ভব হয়েছে তার বক্তব্য ও অনুভূতি প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, এভাবে না হলে তার মধ্যে হয়তো ব্যতিক্রম সৃষ্টি হয়ে উঠত না। এগুলো মিলে তার সৃষ্টি ভুবনের পরিপূর্ণতা, এসবের মধ্য দিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আছেন এবং থাকবেন, হয়তো শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে থেকেও যাবেন।
সকল বড় প্রতিভাই বিকল্পহীন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বিকল্প যে হতে পারেনি এতেই তার প্রকৃত সৃষ্টির ভুবন সুচিহ্নিত হয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার লেখালেখির সঙ্গে একত্রে সৃষ্টি হয়ে আছেন, একটি বর্ণাঢ্য সময় এবং ভুবনকেও তিনি সৃষ্টি করে তুলেছেন। আমাদের সৌভাগ্য এখানেও যে আমাদের মধ্যে, আমাদের নিকটে, আমাদের সামনে তাকে আমরা পেয়েছি।
২৩ জুন অসামান্য সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৯১তম জন্মদিনে তার প্রতি অফুরন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করছি।
লেখক : ড. বদিউজ্জামান, বাংলা একাডেমির গবেষণা বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা।