দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। ছবি : পিএমও
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান তার কূটনৈতিক পদচারণা শুরু করলেন ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে। গত রবিবার রাতে তিনি দেশটির রাজধানী কুয়ালালামপুরে পৌঁছেন। সেখানে দুই দিনের সফর শেষে যাবেন অপর বন্ধুদেশ চীনে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুরে পৌঁছার পরে তাকে দেওয়া হয়েছে লাল গালিচা সংবর্ধনা। সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান সমভিব্যাহারে প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুরে পৌঁছলে সে দেশের ধর্মমন্ত্রী জুলকিফলি হাসান ও তার স্ত্রী অভ্যর্থনা জানান। বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, গতকাল মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় সেদেশের প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকের পর তারা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং পরে একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেছেন, বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত খুলে দিতে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে অধিক পরিমাণে শ্রমিক নিয়োগ এবং অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণেরও অনুরোধ জানিয়েছেন তারেক রহমান। সে সাথে সম্ভব হলে সে দেশে আটক শ্রমিকদের পুনরায় বৈধভাবে নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করারও অনুরোধ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরে ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া এ ব্যাপারে যে সহযোগিতা করেছে এবং শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ইস্যুতে যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, সেজন্য দেশটির সরকার ও জনসাধারণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, দুই নেতার বৈঠকে ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত দুই দেশ মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। তারও আগে ১৯৬২ সালে মালয়েশিয়ার অবিসংবাদিত নেতা ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুংকু আবদুল রহমান পাকিস্তান সফরে এসে ঢাকায় বেশ কয়েক দিন অবস্থান করেছিলেন। সে সময় তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সম্পদ ও সম্ভাবনা দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। নিজের দেশ মালয়েশিয়াকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে তিনি এদেশকে মডেল হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। পরিতাপের বিষয় হলো, পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়া তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তি, পরিকল্পনা ও জনগণের দেশপ্রেমের সংমিশ্রণে উন্নয়নে বাংলাদেশকে যোজন যোজন দূরত্বে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায় ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সফরের মধ্য দিয়ে। তার ওই সফরের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক জোরদার হয়। তারপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এই দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে গেছে। সময়ের পরিক্রমায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যার প্রেক্ষিতে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিক দিয়ে দেশটির অবস্থান দ্বিতীয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর গভীর তাৎপর্য বহন করে। কেননা বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে দুটি দেশই বিভিন্ন বিষয়ে সহমত পোষণ করে আসছে। বাংলাদেশ যেমন আঞ্চলিক ও বিশ্বশান্তির পক্ষে সব সময় সোচ্চার, মালয়েশিয়াও একই ভূমিকা পালন করে আসছে। তা ছাড়া মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক। পণ্যের আমদানি-রপ্তানি ছাড়াও জনশক্তি রপ্তানি তার মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে বাংলাদেশ যেসব দেশে জনশক্তি রপ্তানি করে থাকে, মালয়েশিয়া তার মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে দেশটিতে কয়েক লাখ বাংলাদেশি দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক কর্মরত। যদিও বিগত সরকারের আমল থেকে নানা জটিলতায় দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ওই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-কর্মকর্তাদের দুর্নীতি এবং কতিপয় রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের কারণে তা স্থগিত হয়ে গেছে। সে থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশি জনশক্তির জন্য মালয়েশিয়ার দুয়ার বন্ধই রয়েছে। সে দুয়ার উন্মুক্ত করার গুরুদায়িত্ব বর্তেছে বর্তমান সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর। পাশাপাশি বাংলাদেশে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়েও এ সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের নিমিত্তে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
ব্যক্তিগতভাবে মালয়েশিয়ার প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আকর্ষণের বিষয়টি এখানে উল্লেখ্য। এর আগে তিনি অনেকবার মালয়েশিয়া সফর করেছেন। তখন অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে দেশটির উন্নয়ন ধারায় নিজের সম্মোহিত হওয়ার কথা বলেছেন তিনি। বলেছেন, সুযোগ পেলে বাংলাদেশকে মালয়েশিয়া মডেলে গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন। বলা বাহুল্য, সে সুযোগ এখন তার হাতের মুঠোয়। দেশবাসীর মতো আমরাও বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার দ্বারা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্র ও উন্নয়নের অংশীদার মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ককে অধিকতর উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নতুন করে যে পথচলা শুরু হলো, তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।