× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

ড. মিহির কুমার রায়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ড. মিহির কুমার রায়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী, যার আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩.৭ শতাংশ।

এটি চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। এই বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট। এটি বিএনপি সরকারের ১৭তম এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেট। অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে মোট উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে এবং পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ২৭.২৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মোট ব্যয়ের ৭২.৭৩ শতাংশ পরিচালন খাতে ব্যয় হলেও আগামী অর্থবছরে তা কমিয়ে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের কাঠামোয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের বৃত্ত অতিক্রম করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা হবে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

এখন সার্বিক বাজেট ব্যবস্থাপনায় কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়টি এই প্রবন্ধের আলোচিত বিষয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেটের পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে দাঁড়িয়েছিল ২৪ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূলভিত্তি এই কৃষি খাতকে একটি আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর সরকার। এই রূপরেখায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে সার, বীজ ও সেচসহ কৃষি উপকরণের সুলভ মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিরসন এবং আধুনিক বিপণন ও হিমাগার অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকার কৃষকগণকে কেবল উৎপাদনকারী নয়, বরং ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করেছে। সর্বোপরি, উত্তম কৃষি চর্চার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই রূপান্তর সরকারের অভীষ্ট লক্ষ্য।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার ক্ষমতায় এসেই কৃষক কার্ড চালু করেছে। এ খাতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে কৃষক কার্ড বাবদ ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ১০টি সেবা পাবেন। আগামী অর্থবছরে আরও ১০০টি উপজেলায় সাড়ে ৪২ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়া হবে। দেশের সব কৃষককে পর্যায়ক্রমে এ কার্ড দেওয়া হবে। সরকার সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও কৃষকদের সহায়তা করতে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষিতে অন্যান্য খাতেও ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকার দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খাতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে।

চলতি অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে শুধু ভর্তুকি বাড়ালেই হবে না, এর কার্যকর ব্যবহার এবং কৃষকের কাছে সরাসরি সুবিধা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বহুলাংশে নির্ভরশীল আমদানীকৃত সার ও জ্বালানির ওপর। ইউরিয়া সার উৎপাদনের কাঁচামাল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সারের প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। সেখানে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রতি টন ৪৮০-৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ৭০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে, যার মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ২৬ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ টন আমদানি করতে হয়। এ ছাড়া টিএসপি, ডিএপি, এমওপিসহ অন্যান্য সারও মূলত আমদানি-নির্ভর। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি কেজি ইউরিয়ায় ২১, টিএসপিতে ২৩, ডিএপিতে ৫০ এবং এমওপিতে ৪০ টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তে থাকলে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলে কৃষি বাজেটে এ বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য সরকার সারের দাম বাড়াতে চায় না। এজন্য আগামী বাজেটে সারে মোট ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ব্যয় হবে ১৭ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারের অন্যান্য সার উৎপাদন ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যয় হবে। এই ১০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ২৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি অন্যান্য কোডে রাখা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরেও সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে। এ খাতে ভর্তুকি বাবদ ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বাজেটেও একই পরিমাণ বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে বলে সম্প্রতি অর্থ বিভাগকে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

কৃষি বরাদ্দের ওপর নির্ভর করবে খাদ্যনিরাপত্তা। প্রতিবছরই কৃষি খাতে ভর্তুকি ও বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো হয়। কিন্তু কৃষকের লোকসানের গল্প যেন শেষ হয় না। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় মাঠের কৃষক এখনও আর্থিক সংকটে। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সার ও জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। ফলে নতুন অর্থবছরে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে কৃষি খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও ভর্তুকি অব্যাহত রাখার ওপর। গত এক দশকে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের সাফল্যের কথা তুলে ধরলেও সেই খাদ্যের মূল উৎপাদক কৃষকের অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি। মাঠ গবেষণার অভিজ্ঞতায় সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট। এক বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। সেচ ব্যয় যোগ হলে খরচ দাঁড়ায় আরও প্রায় ৫ হাজার টাকা বেশি। কিন্তু বাজারে ধানের যে দাম, তাতে উৎপাদন খরচই উঠে আসে না। কৃষকের অভিযোগ, সরকার ধান ও চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই সুবিধা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে না। মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে বাজারের মুনাফা চলে যায় অন্যদের কাছে। ফলে কৃষকের আয় বাড়ে না, বরং উৎপাদনের ঝুঁকি ও ব্যয়ই বাড়তে থাকে।

 আমার মতে কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি শুধু কৃষককে সহায়তা করার বিষয় নয়; এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। মধ্যপ্রাচ্যসংকট, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্যবাজারের অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে কৃষি খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এবারের বাজেটে কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ, ভর্তুকি এবং উৎপাদন-সহায়তা কীভাবে পুনর্বিন্যাস করা হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ।

লেখক: ড. মিহির কুমার রায় (গবেষক ও অর্থনীতিবিদ)

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা