শুভ জন্মদিন
ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:৩৩ এএম
আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৯:১৬ পিএম
আহমদ রফিক। সংগৃহীত ফটো
শতাব্দীর
দর্পণ তিনি। তিনি দেখেছেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দেখেছেন সাম্রাজ্যবাদ ও
উপনিবেশবাদবিরোধী উত্তাল সংগ্রাম। দেখেছেন ভারতবিভক্তি। তার তারুণ্যেই ঘটেছে
তেভাগা আন্দোলন, হাজং বিদ্রোহ। আর ভাষা আন্দোলনে তো তিনি নিজেই ছিলেন একজন সক্রিয়
সংগঠক। এমন দীর্ঘ কালযাত্রার মধ্যে দিয়ে আজ ১২ সেপ্টেম্বর ৯৫ তম জন্মদিন উদযাপন
করছেন ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক, প্রাবন্ধিক আহমদ রফিক। আমাদের জন্যে
সৌভাগ্যের ব্যাপার, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি এখনও সক্রিয় রয়েছেন। উজান ঠেলে
বার্ধক্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে এখনও আরাধ্য কর্ম সম্পাদন করে চলেছেন তিনি। শুভ
জন্মদিন, মননশীলতার পথিকৃৎ আহমদ রফিক।
আহমদ রফিক দীপ্তিমান ও কীর্তিমান হয়ে উঠেছেন প্রাত্যহিক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। বিশেষত ছাত্রাবস্থা থেকেই প্রগতিশীল সংগঠন ও সংগ্রাম-আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তিনি অর্জন করেছেন সংগ্রামশীলতা, অর্জন করেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরন্তর সক্রিয় থাকার মননশীলতা ও অভিজ্ঞতা। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ কারণে তাকে কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়তে হয় এবং তিনি আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। এ কারণে তিনি আর চিকিৎসক পেশায় নিজেকে সক্রিয় রাখতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এলেও তিনি সবসময়ই প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। ভাষাসংগ্রামীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই স্বচ্ছ, বস্তুনিষ্ঠ ও নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে এ আন্দোলন নিয়ে গবেষণা-ইতিহাস রচনায় জীবনভর সচেষ্ট রয়েছেন। শুধু তাই নয়, বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন, তিনি তাদেরও অন্যতম। এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখার কারণে ১৯৯৭ সালে কলকাতাভিত্তিক টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাকে ‘বরীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করে। ২০১১ সালে অর্জন করেন বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র পুরস্কার।
ভারত বিভক্তি নিয়েও উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম করেছেন আহমদ রফিক। তাঁর লেখা ‘দেশবিভাগ : ফিরে দেখা’ এ ক্ষেত্রে একটি উল্রেখযোগ্য সংযোজন। লেখাই বাহুল্য, ঐতিহাসিক এই রাজনৈতিক কালপর্ব সংঘটিত হয়েছে তার সামনেই। কেবল তথ্যবহুলতার জন্য নয়, মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অন্তর্দৃষ্টিমূলক বিশ্লেষণের কারণেও এটি এই উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক কালপর্বের রাজনৈতিক ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
প্রসঙ্গত, আহমদ রফিকের জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তদানীন্তন ত্রিপুরা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর গ্রামে। তার মা রহিমা খাতুন, বাবা আবদুল হামিদ এবং স্ত্রী ডা. এসকে রুহুল হাসিন। তিনি ১৯৪৭ সালে নড়াইল মহকুমা হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা, ১৯৪৯ সালে মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক ও ১৯৫৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬০ সালে ওষুধ প্রতিষ্ঠান ‘অ্যালবার্ট ডেভিডে’ টেকনিক্যাল তথ্য বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন আহমদ রফিক। ১৯৬৪ সালে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গড়ে তোলেন স্বদেশী ওষুধ কোম্পানি 'ওরিয়ন ল্যাবরেটরিজ'। ১৯৯৬ সালে এই সংস্থার চেয়ারম্যান পদ থেকে অবসর নেন তিনি। বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি সাহিত্য সাধনায় নিমগ্ন রয়েছেন।
লেখক-গবেষক
হিসেবে আহমদ রফিক দুই বাংলাতেই খ্যাতি অর্জন করেছেন। পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও
সম্মাননা। তিনি সাহিত্যে গবেষণামূলক রচনার জন্য ১৯৭৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার,
১৯৯২ সালে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার ও অগ্রণী ব্যাংক শিল্পসাহিত্য পুরস্কার লাভ
করেন। সাহিত্যে অসামান্য অবদান রাখার জন্য তিনি ১৯৯৫ সালে একুশে পদক পান। বয়সজনিত
কারণে তার চলাফেরা বর্তমানে সীমিত হয়েছে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু মননশীল সৃজনশীল চিন্তা
ও কর্মে তিনি এখনও সক্রিয়। বাঙালির জ্ঞানসাধনার পথপরিক্রমার অন্যতম পথিকৃৎ তিনি।