জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৩ ১১:৩১ এএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৩ ১৮:২৬ পিএম
মানবতার জয়গানে সোচ্চার ছিলেন তিনি। লিখেছেন, ‘গাহি সাম্যের গান—/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্...’। কী প্রেমে, কী দ্রোহে অতুলনীয় তিনি। ‘ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া/ খোদার আসন আরশ ছেদিয়া/ উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর’Ñতাঁর এমন বজ্রনির্ঘোষ কাব্যিক দ্যোতনায় জেগে উঠেছিল বাংলাভাষী সবাই। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে সবার মধ্যে মুক্তির চেতনাসঞ্চারী সেই ‘বিদ্রোহী কবি’, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট, (১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র) ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করবে তাদের এই প্রিয় কবিকে।
কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ঘটনাবহুল। তাঁর জন্ম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায়। ‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’ হয়ে আবির্ভাব ঘটেছিল যে কবির, তাঁর অমূল্য সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যকে উন্নীত করে নতুন বাঁকে। অঙ্কের হিসাবে ৭৭ বছরের জীবনকালে তিনি সৃষ্টিশীল ছিলেন মাত্র ২৩ বছর। কিন্তু বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংগীতে যে অবদান তিনি রেখে গেছেন, তার শক্তি অনিঃশেষ, প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
নজরুলের ডাকনাম ‘দুখু মিয়া’। পিতা কাজী ফকির আহমেদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম। অভাব-অনটন ছিল শৈশব থেকেই নিত্যসঙ্গী। শৈশব কেটেছে লেটোদলের বাদক, রুটির দোকানের শ্রমিক হিসেবে। যৌবনে সেনাদলে যোগ দিয়েছেন সৈনিক হিসেবে। সে চাকরি ছেড়ে এসে করেছেন সাংবাদিকতা। শিল্পী-গীতিকার হিসেবে যুক্ত ছিলেন এইচএমভি ও কলকাতা বেতারে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে পথে নেমেছেন। শাসকের কোপানলে পড়েছেন, কারারুদ্ধ হয়েছেন। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়েও কখনও আপস করেননি তিনি। ‘চির উন্নত মম শির’ বলে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির জন্য। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূপকতার বিরুদ্ধেও ছিলেন উচ্চকণ্ঠ।
১৯২১ সালে কাজী নজরুল ইসলাম তার দুটি অমর বৈপ্লবিক সাহিত্যকর্ম ‘বিদ্রোহী’ ও ‘ভাঙ্গার গান’ রচনার মধ্যে দিয়ে আলোচনার পাদপ্রদীপে উঠে আসেন। বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে মুজফফর আহমেদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। কমরেড মুজফফর আহমেদের অনুরোধে তিনি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ‘জাগো জাগো অনশন-বন্দী, উঠ রে যত’ শীর্ষক কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সংগীত। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’। শুধু কবিতাতেই নয়, গান রচনায় নজরুল অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি প্রায় তিন হাজার গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন। বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। প্রবর্তন করেছেন বাংলা গজলের। তাঁর রচিত ‘চল্ চল্ চল্’ গানটি বাংলাদেশের রণসংগীত।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উদ্যোগ নিয়ে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তাঁকে নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাজী নজরুলকে ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে। একই বছর তাঁকে রাষ্ট্রীয় একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
প্রেম ও দ্রোহের এই কবি লিখেছিলেন, ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে...।’ বাঙালি ভোলেনি জাতীয় কবিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত কবির সমাধি আজ ছেয়ে যাবে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ফুলে ফুলে।
কর্মসূচি
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন-প্রতিষ্ঠান নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছেÑঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন কবির সমাধিতে সকালে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নজরুল ইনস্টিটিউট আয়োজন করেছে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। ছায়ানট সন্ধ্যায় প্রতিষ্ঠানটির মিলনায়তনে সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। নজরুলের ভক্তি-রসের গান দিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের অনুষ্ঠান। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন দিনব্যাপী স্মরণ করবে জাতীয় কবিকে।