প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৩ ১১:৩২ এএম
আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৩ ১১:৩৩ এএম
শামসুর রাহমানের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। প্রবা ফটো
শামসুর রাহমান- কোনো বিশেষণ ছাড়াই যিনি সুপরিচিত সবার কাছে, কী এক অনুক্ত সম্পর্কে তিনি থির হয়ে থাকেন আমাদের হৃদয়ের পাশে আর বারবার ফিরে আসেন উদ্ভট উটের পিঠে চলতে থাকা আমাদের স্বদেশে, আমাদের বিধ্বস্ত নীলিমাতে। কিংবা আমরাই বারবার ফিরে যাই তার কল্যাণমাধুরিমাময় স্পর্শ নিতে। কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি রচনা করে গেছেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’র কবিতা ‘পূর্বলেখ’-এ। লিখেছেন স্নিগ্ধতা মেখে, ‘মনে হয় আমি যেন সেই লোকশ্রুত ল্যাজারাস/তিনদিন ছিলাম কবরে, মৃত-পুনর্জীবনের/মায়াস্পর্শে আবার এসেছি ফিরে পৃথিবীর রোদে...।’
ল্যাজারাস তার মৃত্যুর চার দিন পর জীবিত হয়েছিলেন যিশু খ্রিস্টের ছোঁয়ায়। সেই কাহিনী থেকে কোনো একসময় চিকিৎসাশাস্ত্রের বিষয়আশয়ে যুক্ত হয় ‘ল্যাজারাস সিনড্রোম’; যা দিয়ে বোঝায় মৃত্যুর পরও প্রাণের স্পন্দন ছড়িয়ে পড়ার কোনো অবিশ্বাস্য অথচ বাস্তব আখ্যান। ধারাবাহিক নিরলস এক সাধনার মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার ইতিহাসে, এমনকি বাংলাদেশের ইতিহাসে শামসুর রাহমান হয়ে উঠেছেন তেমন একজন, যার মধ্যে আমরা খুঁজে পাই ল্যাজারাসকে। দেখি এমন একজনকে, যার বারবার পুনর্জন্ম ঘটে। বাংলাদেশে যখনই সংকট আসে, তখনই শামসুর রাহমানের প্রত্যাবর্তন ঘটে; বাংলাদেশে যখনই ক্রান্তিকাল আসে, তখনই আমাদের শামসুর রাহমানকেই মনে পড়ে; এমনকি বাংলাদেশে যখন শান্ত, রৌদ্রস্নিগ্ধ কিংবা বৃষ্টিআচ্ছন্ন মায়াময় দিন আসে, তখনও তাকে উপলব্ধি করি আমরা।
কেননা তিনি আমাদের ইতিহাসের সমান। তার কাছ থেকেই পেয়েছি আমরা ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, তার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েই আমরা ছড়িয়ে দিতে পেরেছি এই ওঙ্কার, ‘আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’ কিংবা যদি চিন্তা করি সেই একাত্তরের কথা, সেখানেও উপস্থিত তিনি ‘গেরিলা’ হয়ে, অবস্থান করছেন অবরুদ্ধ ঢাকায়, কিন্তু গোপনে গেরিলাদের হাত হয়ে তার কবিতা সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে, প্রকাশিত হচ্ছে ছদ্মনামে আর ক্যাম্পে কিংবা রণাঙ্গনে হঠাৎ পাওয়া সামান্য অবসরে অনামা মুক্তিযোদ্ধা আবেগমথিত কণ্ঠে বলে উঠছে সেই কবিতার লাইন, ‘তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছো হাত ধরে পরস্পর।/সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি, দুঃখ-তাড়ানিয়া/তুমি তো আমার ভাই, হে নতুন, সন্তান আমার।’ আবার স্বাধীন দেশে স্বৈরাচার মৌলবাদ অগণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তিনিই তো আমাদের দেখিয়ে দেন, বাংলাদেশ আর্তনাদ করছে বনপোড়া এক হরিণীর মতো।
শামসুর রাহমান, আমাদের এই ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’র মৃত্যুর দিনক্ষণ তাই প্রতিবছর তার পুনর্জন্মেরই দিনক্ষণ হয়ে ফিরে আসে আমাদের কাছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট) বাংলা ভাষার এই মহান কবির ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৬ সালের এই দিনে ৭৭ বছর বয়সে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থান দেহাবসান ঘটে শক্তিমান এই কবির। ১৯৫৭ সালে তার কর্মজীবনের শুরু হয় দৈনিক মর্নিং নিউজে। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদকের দায়িত্ব পান। তবে ১৯৮৭ সালে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের এক পর্যায়ে সেখান থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। আদমজি সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন এই কবি। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকার মাহুতটুলিতে নানার বাড়িতে জন্ম নেওয়া এই কবিকে তার ইচ্ছানুযায়ী ঢাকার বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।