প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬ ১৩:২৩ পিএম
জাতীয় প্রেস ক্লাবে রবিবার সংবাদ সম্মেলন করেন মোহন রায়হান। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মোহন রায়হান।
তিনি বলেন, “আমি জানি, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকবে। তবুও আমি বিশ্বাস করি, বিভাজনের চেয়ে ঐক্য, প্রতিহিংসার চেয়ে প্রজ্ঞা, এবং অপমানের চেয়ে মর্যাদা বেছে নেওয়াই আমাদের কর্তব্য।”
পুরস্কারের অর্থ ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করবেন না বলে জানান মোহন রায়হান। তিনি বলেন, “সেটি কোনো সামর্থ্যহীন কবি, লেখক বা সাংস্কৃতিক কর্মীর কল্যাণে প্রদান করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
জাতীয় প্রেস ক্লাবে রবিবার বেলা পৌনে ১২টায় এক সংবাদ সম্মেলনে মোহন রায়হান বলেন, “বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ প্রদানকে কেন্দ্র করে একটি অনভিপ্রেত, দুঃখজনক এবং বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই- আমি কখনও এই পুরস্কারের প্রত্যাশী ছিলাম না, কোনও তদবির বা প্রচেষ্টা করিনি। বাংলা একাডেমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমাকে মনোনীত করেছিল।”
পুরস্কারের তালিকায় নাম ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি সুসংগঠিত অপপ্রচার শুরু করে বলে জানান মোহন রায়হান। তিনি বলেন, “একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী- যারা অতীতে স্বৈরাচার ও স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির সহচর ছিল, নতুন পরিচয়ের আড়ালে তারা সামাজিক মাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়াতে থাকে।”
তিনি বলেন, “এমনকি ২২ জন লেখক, কবি ও সাংবাদিকের নামে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়, যাদের অনেকেই পরে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন- তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। একজন নারী সাংবাদিক কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছেন, “আমি কি কখনও তোমার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিতে পারি?”
পুরস্কার প্রদানের আগের দিন পর্যন্ত সব আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল বলেও জানান মোহন রায়হান। তিনি বলেন, “কিন্তু শেষ মুহূর্তে, ৪১ বছর আগে রচিত একটি কবিতাকে অজুহাত করে আমার পুরস্কার স্থগিত করা হয়। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম, অথচ অন্যদের ডাকা হলেও আমাকে আর ডাকা হয়নি। এই আচরণ শুধু ব্যক্তিগত অপমান নয়- এটি মুক্তচিন্তার প্রতি অবমাননা।”
তিনি জানান, “ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করার পর দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্রধান সংবাদমাধ্যম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে। বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রশ্ন তোলেন যদি শিল্প সাহিত্যকে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে রাখার অঙ্গীকার থাকে, তবে এই সিদ্ধান্ত তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কেন?”
তিনি বলেন, “পরবর্তীতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিক্রমে আগামী ২ মার্চ আমাকে পুরস্কার প্রদান করা হবে। এমন বাস্তবতায় ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ”-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভা আহ্বান করা হয়। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত পুরস্কার গ্রহণের পক্ষে।”
তিনি বলেন, “যুক্তি ছিল, যড়যন্ত্রের কাছে নতি স্বীকার করা মানে অপশক্তিকে জয়ী হতে দেওয়া। আবার অনেকে মত দেন-এই অপমানের প্রতিবাদে পুরস্কার বর্জনই নৈতিক অবস্থান হবে। আমি গভীরভাবে ভাবলাম। আমি কোনো পদক বা অর্থের কাঙাল নই। জীবনের সায়াহ্নে এসে সামান্য স্বীকৃতি ও সম্মানের প্রত্যাশাই আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল।”
মোহন রয়হান আরও বলেন, “আমি স্মরণ করি-রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে আমরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সঙ্গেও দুই দফা আলোচনা হয়েছে। আমরা স্পষ্ট বলেছিলাম- আমাদের চাওয়া একটাই, কলমের স্বাধীনতা। কথা বলার স্বাধীনতা। তিনি বলেছিলেন- ‘ভালো কাজে উৎসাহ দেবেন, ভুল করলে সমালোচনা করবেন।’ আমি সেই প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা রেখেই পুরস্কার গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।”
সংবাদ সম্মেলনে পুরস্কার প্রদানের নীতিমালা সংস্কার করারও দাবি জানান তিনি। বলেন, “স্বচ্ছ, দলনিরপেক্ষ, বিশেষজ্ঞনির্ভর ও সর্বজনগ্রাহ্য প্রক্রিয়া প্রবর্তন করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কোনও পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক বা স্থগিতের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।”
প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করার ইচ্ছার কথা জানিয়ে মোহন রায়হান বলেন, “আমি বিনীতভাবে অনুরোধ জানাই-নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকেই যেন আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করতে পারি। যদি প্রয়োজন হয়, দিন পরিবর্তন করা হোক-কিন্তু প্রক্রিয়াটি মর্যাদাপূর্ণ হোক।”