কবি শামসুর রাহমান
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৫৮ এএম
‘বহুদিন থেকে/ আমাদের পৃথিবীতে শান্তি পলাতক/ সময়ের বিমর্ষ কিনারে এসে তবু/ সোনালী দিনের আশা রাখি।/ সেই আশা চিরঞ্জীব হয়ে রয় নবজাত সূর্যের ললাটে।’ ‘নতুন কবিতা’ শিরোনামে কবিতার মতোই সারাজীবনের কবিতায়-রচনায় মানুষকে আশার কথা শোনানোর আজীবন সমর্পিত কবি শামসুর রাহমান। ‘রূপালি স্নান’ থেকে তার কবিতাযাত্রা গন্তব্য পেয়েছে রক্ত আর মিছিলের স্রোতে। মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের একান্ত অনুভব-উপলব্ধিকে যেমন তিনি কবিতা করে তুলেছেন, তেমনি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কণ্ঠকে ভাষা দিয়েছেন। রাষ্ট্র ও সমাজের অসংগতি, প্রেম ও মুক্তিচেতনা এবং উদার মানবিক বোধের বাংলা কবিতার উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের অন্যতম এই কবির আজ ৯৬তম জন্মদিন।
তার ‘হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো’ কাব্যগ্রন্থের ‘তোমার জন্মদিন’ কবিতার ভাষাতেই বলা যায়- ‘মোরগের গর্বিত ঝুঁটি, স্বপ্নে-দেখা/ রক্তিম ফুলের উন্মীলন, অন্ধকার ঠেলে/ ঘোষণা করে, আজ তোমার জন্মদিন।/ আমার হৃদয়ের রোদের ঝলক/ পবিত্র, ভাস্বর আয়াতের ছন্দে জানায়, / আজ তোমার জন্মদিন।’
আবহমান বাংলার জনজীবন ও প্রকৃতির রূপময় বর্ণনার এবং আমাদের সাহিত্যিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের ছাপচিত্রের এই কবি ১৯২৯ সালের এই দিনে ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্ম নিয়েছিলেন। মা আমেনা বেগম এবং বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী। পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার পাড়াতলী গ্রামে। ১৩ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। আধুনিক বাংলা কাব্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের পড়াশোনায় হাতেখড়ি পোগোজ স্কুলে।
ঢাকা নগরেই তার বেড়ে ওঠা। নাগরিক কষ্ট, দুঃখ-সুখ তার কবিতায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। জীবনের সত্য-সুন্দরকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। তার বেড়ে ওঠার ইতিহাস আমাদের কবিতার অগ্রযাত্রারও ইতিহাস। রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে শামসুর রাহমানের কবিতা আমাদের ইতিহাসের বিশ্বস্ত সাক্ষ্য হয়ে আছে। তিনি ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পর্যন্ত আমাদের ইতিহাসের প্রতিটি বিন্দুকে স্পর্শ করেছেন। কবিতার সঙ্গে জনবিচ্ছিন্নতার অপবাদ শামসুর রাহমান একেবারেই ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন। এজন্য শামসুর রাহমান যেমন বারবার আমাদের স্মরণে আসবেন তেমনি থাকবেন আমাদের প্রতিদিনের স্বপ্ন ও সংগ্রামে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লেখা তার দুটি কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ সময়োত্তীর্ণ কাব্যিক দলিল। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘বন্দি শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থটি তাকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ৬০টি কাব্যগ্রন্থ, চারটি উপন্যাস, একটি প্রবন্ধগ্রন্থ, একটি ছড়ার বই ও ছয়টি অনুবাদগ্রন্থসহ তার প্রকাশিত গ্রন্থ শতাধিক। পেয়েছেন স্বাধীনতা পদক, একুশে পদকসহ একাধিক পুরস্কার। ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। আমৃত্যু স্বাধীনতার চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতি একনিষ্ঠ এই কবি ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট মারা যান।