রামমোহন রায় লাইব্রেরি
হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫ ১৬:৪৩ পিএম
পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে অবস্থিত রামমোহন রায় লাইব্রেরি ঢেলে সাজানো হচ্ছে। পাঠকের জন্য স্থপন করা হয়েছে চেয়ার-টেবিল। নতুন রঙ পড়েছে পুরানো দেয়ালে। প্রবা ফটো
ঢাকার ইতিহাস খুঁজতে গেলেই স্বাভাবিকভাবেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরান ঢাকা। ঢাকার গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে প্রায় সকল কিছুই একসময় ছিল এই পুরান ঢাকা কেন্দ্রিক। সম্প্রতি দেশের এক গবেষক দল এই পুরান ঢাকায় খনন করে এমন কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পেয়েছেন, যা ঢাকার গোড়াপত্তনের ইতিহাস আমূল পাল্টে দিয়েছে। যাতে উঠে এসেছেÑ মোগল সুবাদার ইসলাম খান ১৬১০ সালে নগর ঢাকার পত্তন করেন বলে যে ইতিহাস এতদিন প্রচলিত ছিল তা সঠিক নয়; ঢাকার গোড়াপত্তন হয়েছে যিশু খ্রিস্টের জন্মেরও বহু আগে। সুতরাং ঢাকার বয়স ৪০০ বছর নয়, ঢাকার বয়স আড়াই হাজার বছরেরও বেশি। তবে ঢাকার গোড়াপত্তনের ইতিহাসের আমূল পরিবর্তন ঘটলেও এখনও ঢাকার ইতিহাসের প্রথম পাঠাগার ‘রামমোহন রায় লাইব্রেরি’।
ইতিহাসের আলোকিত পথরেখায় ১৮৭১ সালে পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে অবস্থিত ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই পাঠাগারটি। পরে ১৯১০ সাল থেকে লাইব্রেরির কার্যক্রম শুরু হয় ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ ভবনের অদূরে নির্মিত একটি দ্বিতল ভবনে। মাঝখানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাদে সেখানেই ২০০৩ সাল পর্যন্ত চলে লাইব্রেরিটির কার্যক্রম। তারপর লাইব্রেরি ভবনটি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় ২০০৪ সাল থেকে পাঠাগারটি বন্ধ হয়ে যায়। ১০ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি থেকে ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ ভবনের দ্বিতীয় তলার যে ঘরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘রামমোহন রায় লাইব্রেরি’, ইতিহাসের পথপরিক্রমায় বর্তমানে সেখানেই চলছে এর কার্যক্রম। তবে আঁতুড়ঘরে ফিরে যাওয়া ঐতিহাসিক এই লাইব্রেরিটি হারিয়েছে তার জৌলুস।
সরেজমিনে দেখা যায়Ñ অল্প কিছু প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল আর কিছু বই এখন লাইব্রেরিটির সম্বল। ব্রাহ্ম সমাজ ভবনের নড়বড়ে কাঠের পাটাতন আর অপ্রশস্ত খাড়া সিঁড়ি পেরিয়ে ঢুকতে হয় লাইব্রেরিটির বর্তমান স্থলে। আনুমানিক ২০০ স্কয়ার ফিটের এই রুমে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে দেওয়ালে টাঙানোÑ রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনান্দ দাশসহ বিভিন্ন কবি-লেখক ও বিশ্ব ইতিহাসের ব্যক্তিবর্গের ছবি। এসবের মধ্যেই চোখ টেনে নেয় একসময়ে ৩০ হাজারেরও বেশি বইয়ে সমৃদ্ধ থাকা এ লাইব্রেরির দেয়ালের মাঝে তৈরি বেশ কয়েকটি বইয়ের তাকে সাজানো বিভিন্ন সময়ের আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ বই। বইয়ের তাক ঘেঁটে দেখা মেলেÑ লাইব্রেরির অধিকাংশ বই-ই এই সময়ের। আর কিছু বই আছে পুরনো, যেগুলো কোনোভাবেই হাতে ধরে পড়ার উপযোগী নয়।
পাঠাগারটির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক রণবীর পাল রবি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এখন লাইব্রেরিতে আগের মতো বইও যেমন নেই, পাঠকও নেই। পাঁচ থেকে ৬০০ বই আছে। এখন প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ জন পাঠক আসে। আর সপ্তাহের প্রতি শনিবার ও রবিবার পাঠাগারটি বন্ধ থাকে। তবে আমরা চাই পাঠাগারটিতে প্রতিদিনই পাঠক আসুক, বই পড়ুক।
অথচ একসময় ৩০ হাজারেরও বেশি বইয়ে সমৃদ্ধ এই পাঠাগারে ১৯২৬ সালে এসেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জানা যায়Ñ ১৯২৪ সালে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ এখানেই লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এই পাঠাগারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জীবনানন্দের মা কবি কুসুমকুমারী দেবীও। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাঠাগারটি। এখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করেছিল। সে সময় লুট হয়ে যায় শত বছরের পুরনো মূল্যবান নথিপত্র, সাময়িকী ও কিছু দুর্লভ বই।
এমন ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পাঠাগারটি নিয়ে আগামী দিনের ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে রনবীর পাল রবি বলেন, তিলোত্তমা ঢাকার গোড়াপত্তন হয় আজকের পুরান ঢাকা থেকে। সমগ্র ঢাকার মধ্যে এখনও পুরান ঢাকা বৃহৎ এডুকেশন জোন (শিক্ষাঞ্চল)। খুব স্বাভাবিকভাবে এ অঞ্চলে বিশাল পাঠকের পরিবেশ আছে। কিন্তু এখানে একটা ভালোমানের পাঠাগার নেই। স্বপ্ন দেখি– রামমোহন রায় লাইব্রেরিকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কাছাকাছি মানের একটা লাইব্রেরি আকারে গড়ে তোলার।
লাইব্রেরি গবেষক ও সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের সভাপতি আব্দুস সাত্তার খান বলেন, যুগসৃষ্টিকারী রাজা রামমোহন রায়ের নামের এ পাঠাগারটি আমাদের ঐতিহ্য। এই লাইব্রেরিটির এখন ভগ্নদশা। এ থেকে উত্তরণ করার জন্য লাইব্রেরিটিকে ঐতিহ্য ঘোষণা করা হোক এবং নতুন করে ঢেলে সাজানো হোক। এই দায়িত্বটা সরকারের নেওয়া উচিত বলেই আমি মনে করি। তা না হলেÑ ঢাকার প্রথম পাঠাগার শুধু ইতিহাসের পাতায় রয়ে যাবে।