× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাক্ষাৎকার

চলচ্চত্রিকার তারেক মাসুদের সাথে আলাপন

লোপা মমতাজ

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২২ ২১:১৮ পিএম

আপডেট : ১৯ জুন ২০২২ ২১:৪২ পিএম

তারেক মাসুদ

তারেক মাসুদ

তারেক মাসুদের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার শুরু গ্রামের মাদ্রাসায়।  কিন্তু শেষাবধি তিনি হয়েছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক চলচ্চিত্র আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব।  তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর সাফল্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি দেশের চলচ্চিত্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নবিষয়ক কর্মকাণ্ডসহ চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখিতে যেমন সক্রিয় ছিলেন তেমনি সক্রিয় ছিলেন চলচ্চিত্রবিষয়ক ভাবনা বিনিময়ে।  এই আলাপে জানবো চলচ্চিত্রকার নিয়ে তার চিন্তার জগত। 

লোপা মমতাজ : একজন চলচিত্র পরিচালক ইচ্ছে করলেই সিনেমার পর্দায় দর্শকদেরকে অতীতের যে কেনো জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন, সেই পরিচালকই যখন অতীতের দিকে ফিরে যায় তখন তাঁর শৈশবের কোন স্মৃতিগুলি মনে আসে?

তারেক মাসুদ : শুধু চলচ্চিত্রকার হিসেবে নয়, আমার মনে হয় যেকোনো মানুষের জন্য শৈশব হচ্ছে একটা বিরাট ট্রেজার। সেখানে সে বার বার ফিরে যায়। শৈশব জীবনের একটা ইনোসেন্ট সেশন। আলাদা কোনো স্বার্থ নেই। শৈশবে কৌতূহল থাকে জীবন-জগত, পরিবেশটাকে দেখার এবং ওগুলো হয়ত এমন একটা ইম্প্রেশন তৈরি করে যা সে আজীবন ফিরে ফিরে দেখে, মনের মধ্যে লালন করে। শিল্পীরা বিশেষত আমার মনে হয়, শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্রে তাঁদের শৈশবকে বার বার ফিরিরে আনেন। আমার শৈশবটা আসলে তেমন আহামরি কিছু ছিল না। একটু ভিন্ন এই অর্থে যে, আমি সাধারণ শিক্ষাক্রমে যুক্ত ছিলাম না, আমি কোনোদিন স্কুলে পড়িনি, বোর্ডিং, মাদ্রাসায় পড়েছিÑ এটাই যা ভিন্ন। তাছাড়া একদম অরডিনারি।

লোপা : আজ আপনার পরিচয় একজন চলচিত্র নির্মাতা, কিন্তু আপনি নিজে কী হতে চেয়েছিলেন?

তারেক : আগেই বলেছি যে, আমি রেগুলার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠিনি, একাত্তর সাল পর্যন্ত আমি মাদ্রাসায় পড়েছি। আমি যে মাদ্রাসায় পড়েছি সেখানে বাংলা ছিলো না। আমার পরিক্ষার মাধ্যাম ছিলো উর্দু। আমার তেমন কোনো স্বপ্ন ছিল না। তবে আমার খুব ভালো লাগত সঙ্গীত। আমার মনে আছে, আমাদের বৃহত্তর পরিবারের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা সঙ্গীত শিল্পী যেমন মাহমুদুর রহমান বেনু। তাঁর মতো আমাদের পরিবারে অনেকেই আমার আদর্শ ছিল। তারপর আমার এক মামা ছিল ডাক নাম দুলু মিয়া। অল্প সময়ের মধ্যে অনেক সুন্দর স্ন্দুর জিনিস বানিয়ে ফেলতেন মাটি দিয়ে, পাতা দিয়ে। ওটাও আমাকে আকৃষ্ট করত। 

লোপা : যে কাজগুলো আপনি পারছেন না, আপনার স্ত্রী ক্যাথরিন বা অন্য কেউ পারছে, তখন কি আপনার মধ্যে ঈর্ষা কাজ করে?

তারেক : আমি জানি না ঠিক ঈর্ষা বলব কিনা, কিন্তু একধরনের অক্ষমতা তো তৈরি হয়। অক্ষমতা আসলে সবারই আছে। খুব সাধারণ থেকে অসাধারণ মানুষেরও অক্ষমতা থাকে। যারা যত কঠিন অবস্থায়, যত প্রতিকুল অবস্থায় বড় হয়, তাদের শুধু শারীরিক নয় মানসিক পেশীটাও তত শক্তিশালী হয়। একপর্যায়ে সে বুঝতে পারে কী করতে হবে। 

লোপা : এবার আপনার সৃষ্টিতে আসি, মাটির ময়না, আদম সুরত তারপর মুক্তির গান, প্রচলিত অর্থে মুনাফা অর্জনের জন্য আপনি ছবিগুলি তৈরি করেননি, কেন?

তারেক : আমি মনে করি আমরা যা বানাই সেগুলো প্রধানত সৃজনশীল উদ্দেশ্যেই বানাই কিন্তু এটা অবাণিজ্যিক ছবি। এই ছবিগুলো থেকে দর্শকের পৃষ্ঠপোষকতায় যে অর্থ পাই তা দিয়েই কিন্তু পরের ছবি বানাতে পারি। আগের ছবি যদি তারা না দেখত তবে পরের ছবি বানাতে অসুবিধা হত। হয়ত আমাদের ব্লগ বাস্টার ছবি হয় না। যদিও আমি মনে করি মুক্তির গান থেকে যে অর্থ আমি পেয়েছি সেটা যে কোনো ব্লগ বাস্টার বা বক্স অফিস হিট করা বাণিজ্যিক ছবি থেকে কম নয়। আমাদের ছবি থেকে বড় বাণিজ্যিক ছবির পার্থক্য অর্থিকভাবে ধরলে ওই ছবি হয়ত টানা ৬মাস চলল, কিন্তু তারপর কিন্তু আর রী-রীলিজ হয় না। অথচ আমাদের ছবি কিন্তু বিশ বছর ধরে এখনও বিক্রি হচ্ছে। দেশে, দেশের বাইরে এবং কোনো কোনো টেলিভিশন কিন্তু প্রতিবছর আমাদের মুক্তির গান কিনে দেখাচ্ছে। মুক্তির কথা’র ডিভিডি বের হচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে। মাটির ময়নাও তাই। হয়ত একসঙ্গে অনেক টাকা পাচ্ছি না। একজন ভালো বা বিখ্যাত নির্মাতার প্রতিটি ছবি যে সফল হবে এমন কোনো কথা নেই। জনরুচির কারণে, দর্শকভেদে কোনো ছবি সফল হবে কোনো ছবি হবে না। তবে দর্শককে আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। 

লোপা : আপনি মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। যতদূর জেনেছি সেখানের কঠিন অনুশাষণের মধ্যে বেড়ে ওঠা আপনার ভালো লাগতো না। সে রকমের একটা পরিবেশ থেকে বেড়ে উঠে চলচ্চিত্রে কেন?

তারেক : আমি যে পরিবেশে বড় হয়েছি সেখানে চলচ্চিত্র দেখা নিষিদ্ধ ছিলো। এমন কি ছবি তোলাও। আগেই বলেছি আমি একাত্তর সাল পর্যন্ত মাদ্রাসায় পড়েছি। বহুবার এক মাদ্রাসা থেকে অন্য মাদ্রাসা পরিবর্তন করিয়েছিলেন আমার বাবা। আমি ভিন্ন ভিন্ন অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। এই ভিন্নতার মধ্যে অনেক কিছু অনুভব করার চেষ্টা করতাম। তারপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। মাদ্রাসা থেকে মুক্তি পাই মুক্তিযুদ্ধের সুবাদে। যুদ্ধের সময় সব মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।  যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে আমি আর মাদ্রাসায় ফিরে যাইনি। একটি স্কুল থেকে পরিক্ষা দিয়ে মেট্রিক পাশ করি। এরপর আমি ঢাকায় চলে আসি। আইএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন ঢাকার আর্ট কলেজ এখন যেটা চারুকলা সেখানে আমার বেশ যাতায়াত ছিলো। এখানেই এস এম সুলতানের সাথে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে। আমি তাঁকে নিয়ে কাজ শুরু করি ‘আদম সুরত’। একসময় আমি দেখলাম, আমি যা ভাবি, যা বলতে চাই তা সিনেমার মাধ্যমে বলা সম্ভব। এখানে একজন নির্মাতা স্বাধীনভাবে সৃজনশীল কাজ করতে পারে।

লোপা : আদম সুরত কেন?

তারেক : আমি যখন দেশের বাইরে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়তে যাবো ঠিক করেছি তার আগে থেকেই আমার ভাবনার মধ্যে ব্যাপারটা ছিল। বাইরে যাবার টাকাও জোগাড় করে ফেলেছি। ঠিক সেই সময় খবর পেলাম শিল্পী এস এম সুলতান অসুস্থ। তখন যদি পড়তে চলে যাই তবে হয়তো এসে শুনবো তিনি আর নেই। ওই অবস্থায় সিদ্ধান্ত নিলাম পড়তে না যেয়ে  জোগাড় করা টাকা দিয়েই প্রামাণ্যচিত্র বানাবো। 

লোপা : এর পরের ঘটনা আমরা জানি। তখন আপনি মিশুক মুনীরকে নিয়ে কাজ শুরু করলেন।

তারেক : হ্যাঁ। আমি তখন মিশুক মুনীরকে নিয়ে কাজটা শুরু করলাম। সে সময় আমাদের দুজনেরই চলচ্চিত্র নির্মাণ বিষয়ে বিশেষ কোনো জ্ঞান ছিলো না। আমি যখন মিশুককে ক্যামেরার কাজটা করতে বললাম, তখন মিশুক বললো, আমি তো ক্যামেরা চালাতে জানি না। এর উত্তরে আমি বলেছিলাম, আমিও পরিচালনা করতে জানি না। আমরা যেতে যেতে শিখবো।

লোপা : দারুন ব্যাপার। এ ব্যাপারে আপনারা যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন? 

তারেক : আমরা আসলে ইচ্ছার প্রকাশ ঘটাতে চেয়েছিলাম। এর জন্য আমি সাত বছর সময় নিয়েছি। তারপর তৈরি করেছি আদম সুরত। অনেক বড় মাপের একজন শিল্পী এস এম সুলতান। তার কাছাকাছি অনেকদিন ধরে কাজ করতে করতে জীবন সম্পর্কে, শিল্প সম্পর্কে, শিল্পের দার্শনিকতা সম্পর্কে অনেক কিছু নিজের মধ্যে ধারণ করতে পেরেছি।

লোপা : তারেক ভাই আমার সাথে তাঁর দুবার দেখা হয়েছিলো। শিশুর মতো কেমন একটা সারল্য আছে তাঁর ভেতর। এটা তাঁকে আমার দুইবার দেখা এবং আলাপের অনূভুতি। অথচ আদম সুরত তৈরি করতে গিয়ে আপনার দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কেটেছে শিল্পি এস এম সুলতানের সাথে। থেকেছেন, খেয়েছেন, অনেক বিষয়ে ভাবনার আদান-প্রদান করেছেন সেই সব দিনে দেখা তাঁর সম্পর্কে আপনার অবজারভেশন কি? 

তারেক : তিনি অত্যন্ত বিনয়ী। তাঁর এই বিনয় শুধু তার সিনিয়রদের প্রতি ছিলো এমন কিন্তু না, তিনি জুনিয়রদেরকেও একইভাবে সম্মান করতেন। যেমন আমার থেকে ডাবল বয়স ছিলো তাঁর অথচ তিনি আমাকে  ‘তারেক ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর প্রচন্ড দরদ ছিলো। বাংলার কৃষকদের সাথে তাঁর জীবনের অনেকটা সময় তিনি কাটিয়েছেন। তিনি সেখানে থেকেছেন এবং তাঁদের জীবন সংগ্রামকে পেইন্টিং-এ তুলে ধরেছেন। তিনি দেখেছেন কৃষকদের কী অসীম আত্মবল, কী আসীম মনোবল এবং তাদের যে মানসিক শক্তি সেটা দিয়ে তাঁরা যে জীবনের সাথে সংগ্রাম করে চলছে সেখানে তাঁরা কখনোই পরাজিত হয় না। কৃষকের এই পরিচয়টাই তিনি তাঁর পেইন্টিংয়ের মধ্য দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন। তাঁর সময়ের বা আগের অন্যান্য আর্টিস্টের পেইন্টিংয়ের সাথে কিন্তু এস এম সুলতানের পেইন্টিংয়ের কোনো মিল নেই। সুলতানের ছবি, অনেক বেশি ফিগারেটিভ কিন্তু তা রিয়্যালিস্টিকও নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু, মোর দ্যান রিয়্যাল। এক ধরনের ম্যাজিক রিয়্যালিজম বা স্যুররিয়ালিজম তাঁর ছবির মধ্যে আছে। তিনি এতো কাছ থেকে কৃষকের জীবন দেখেছেন যাকে বলে ফ্রগ আই ভিউ। ফ্রগ কিন্তু মানুষ বা তার কাছাকাছি জিনিসকে খুব বড় করে দেখে। বার্ড আই ভিউ থেকে একেবারে বিপরীত। তার আকার স্ট্রোকে ভিন্নতা আছে, মানুষকে দেখার ভিউ অফ পয়েন্টে ভিন্নতা, তাঁর শিল্পক্রমে একটা ফিলোসফিক্যাল আউটলুক আছে যেটা সকলের চেয়ে ভিন্ন। তাঁর এই ভিন্নতার মূল্যায়ন আমি মনে করি এখনো হয়নি।

লোপা : একজন চলচ্চিত্র পরিচালক যখন ক্যামেরায় চোখ রাখেন তখন সে সমাজের ভুল-ত্র“টিগুলি ক্যামেরায় তুলে আনেন কিন্তু যখন তিনি নিজেই ভুল করেন? 

তারেক : আমার মনে হয় প্রকৃত শিল্পী সমাজের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরতে গিয়ে তাঁর শিল্পকলায় নিজের এক ধরনের আত্ম-সমালোচনাই করেন। আমি মনে করি মাটির ময়না আমার জন্য একটা সেলফ থেরাপি। আই লুকড ইন টু মাইসেলফ এন্ড আই ট্রাই টু কাম ইনট্রামস অব মাই অউন চাইল্ডহুড। আমার শৈশবের ট্রমা, আমার শৈশবের যে সময় বা যে জিনিসটার মধ্য দিয়ে গিয়েছি, আমি তার সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসতে চেষ্টা করেছি। শিল্পী কিন্তু শুধু সমাজের জন্য, বাইরের জন্য কাজ করেন না, তিনি শুধু সমাজকে শুদ্ধ করার জন্য, সামালোচনার জন্য কাজ করেন না, নিজেকে শুধরাবার জন্যও করেন। এবং সমাজ যদি হয় সমালোচনার তবে সেটা নিজের সমাজ। আমি অন্য সমাজকে, যেমন মার্কিন সমাজকে আমার সমালোচনায় জরুরী মনে করি না। ভারতে যদি সাম্প্রদায়িকতা থাকে তবে একজন ভারতীয় নির্মাতার দায়িত্ব সেই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, সেই সমাজের মধ্যে যদি কলুষতা থাকে সেটাকে সমালোচনা করা। আমি আমার সমাজকে, আমার ধর্মকে, আমার নিজের সম্প্রদায়কে সমালোচনা করব। এটা আমার অধিকার। আমি মনে করি ভুলটাকে কাজের মধ্যে দিয়ে বার বার ফিরিয়ে আনতে হয় শিল্পীকে। 

লোপা : এমন কোনো ভুলের কথা কি মনে পড়ছে?

তারেক : অসংখ্য। আমি তো মনে করি রবীন্দ্রনাথের একটা কথা আছে ‘ওরে সাবধানে পথিক, বারেক পথ ভুলে মর ফিরে’। অর্থাৎ যারা সফল হয় তাঁরা আসলে যতটা না প্রতিভাবান, তার চেয়ে বেশী তাঁদের সাহস। ঝুঁকি নেন তারা। আমি তো মনে করি ছবি বানানো ইটস এ লার্নিং না শুধু, আ লার্নিং প্রসেস। আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি করেছি, আমি সবসময় বলি এটা অনেকটা পুনুরাবৃত্তির মতো শোনাবে কিন্তু আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যত ভুল ধারণা ছিল সেটা আমি শিখতে পেরেছি। সেই ভুলগুলো যে ভুল সেটা ছবি বানাতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি, তার আগে আমি কিছু জানতাম না। ছবি যখন আমার শেষ হয়, তখন আসলে আমি সেই বিষয় জানতে পারি। আমি যদি জানতাম মুক্তির গান করতে আমার পাঁচ বছর লাগবে, ঘূর্ণাক্ষরেও, কেনোভাবেই আমি সাহস পেতাম না। কিন্তু কাজটা করে একটা ভুল হয়ে গেছে, সেই ভুল থেকেই একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। ছবি কী হয়েছে জানি না। আমি একটা বিরাট অভিজ্ঞতা পেয়েছি। চার বছর ধরে একটা ছবি বানানো, আরও চার বছর ধরে সেটা দেখানোÑ আমাদের পুরো তারুণ্যটা চলে গেছে। যখন একটা ফ্যামিলি করার বয়স, একটা পরিবারের মতো করে বেড়ে ওঠার বয়স, সেই সময়টা আমাদের একধরনের পাগলামির মধ্যে, ভুলের মধ্যে ব্যয় হয়েছে। ভুলে ভরা এ জীবন। কিন্তু তা থেকে যা পেয়েছিÑ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পেরেছি, এ তো অবিশ্বাস্য!    

লোপা : নিজেই যখন ভুল করে ফেলেন তখন কার কাছে আশ্রয় প্রার্থণা করেন?

তারেক : খুব কাছাকাছি মানুষ ক্যাথরিন। ক্যাথরিন হচ্ছে আমার সব চেয়ে বড় সমালোচক। আমি হয়তো বলেছি যে, আমি খুব আবেগপ্রবণ। ক্যাথরিন অনেক মেথডিক্যাল। সে কিন্তু অনেক ভেবে চিন্তে কাজ করে। আমি তা করি না। তো এ দুটোর একটা ব্যালেন্স হয়। ক্যাথরিন হয়তো বলল, ‘না এটার দরকার নেই, এই ছবিটা বেশি এম্বিসাস, এটা করা যাবে না। লেটস স্টপ হিয়ার।’ সো আই লার্ণড ফ্রম হার। অনেক সময় ভুল করি, সে ভুল থেকেও হয়তো পরে প্রমাণিত হয় যে, ইট ওয়াজ নট দ্যাট মিস্টেক। কিন্তু সাধারণত আমি বেশি ভুল করি। ক্যাথরিন কম ভুল করে। 

লোপা : এখন যারা কাজ করছেন তাঁদের কাজ দেখে কি আপনার মনে হয় কোথাও আটকে গেছেন তাঁরা?

তারেক : অনেকেই কিন্তু ভালো কাজ করছেন এখন। অনেকে বিদেশ থেকে এই বিষয়ে ভাল ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। কেউ বিজ্ঞাপন বানাচ্ছে, কেউ নাটক বানাচ্ছে। তবে হ্যা  এই নির্মাতাদের কারো কারো কাজে এক ধরনের এক ঘেয়েমিপনা আছে। আসলে প্রতিনিয়ত নিজেকে রিনিউ করতে হয়। আমি যখন কাজ করি একটা বিষয় মাথায় রাখি আর তা হলো দেশের মানুষের কথা।  মানুষের, সমাজের যে অংশ নিয়ে বলে না কেউ কিন্তু বলা দরকার, আমি সেখানে আলো ফেলার চেষ্টা করি। তো যারা এখন কাজ করছে তাদের প্রয়োজন তার আশপাশের যে এলিমেণ্টগুলো আছে সেখানে তাকানো। অন্যের গল্প নয় নিজের গল্প-কথা, নিজের পরিবেশের কত কত গল্প আর এগুলো মধ্য দিয়েই গল্পটা হয়ে উঠবে বৈচিত্রময় । আর তখনি এটা হয়ে উঠবে একটা মৌলিক গল্প।

লোপা : আচ্ছা এখন যে ধরনের ছবি, ছবির গল্প, চিত্রনাট্য, সংলাপ তৈরি হচ্ছে তা দিয়ে কি আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের অবস্থান নেয়া সম্ভব?

তারেক : এখন যা হচ্ছে তা এককথায় নিম্নমানের। এই দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ছবি পাঠানো নিরর্থক। কোনো একজন নির্মাতার ছবি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও আমি মনে করি কোনো দেশের ছবি একক কোনো সাফল্যের মধ্য দিয়ে আগাতে পারে না। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সকলের ধারাবাহিকভাবে চলচ্চিত্র চর্চার প্রয়োজন। এটা একদিনে দুইদিনে সম্ভব নয়। আর এটা একক কোনো ব্যাক্তির কাজও না। প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সেই সাথে সরকারি সহযোগিতা। সেটা কেমন? সেটা হলো একটা সুস্থ্য চলচিত্র নির্মাণের নীতিমালা তৈরি করা। 

লোপা : আবার যদি সুযোগ আসে যে কাজগুলি করে এসেছেন সে কাজগুলি শুরু থেকে করার, তাহলে কোন ভুলগুলি শুধরে শুরু করবেন?

তারেক : না, এইখানে আমি বলব না যে আমার আত্মতৃপ্তি নেই। আসলে অনেক কিছু আমরা আগে করতে পারতাম। আমার মনে হয় এই সময়ের একজন তরুণ-তরুণী, তোমরা যেভাবে পেশাদারিত্বের সাথে জীবনকে নাও, আমি তরুণ বয়সে তা পারিনি, খুব বোহেমিয়ান ছিলাম। খুব খামখেয়ালী ছিলাম। এটা নিয়ে আমি শ্লাঘা বোধ করি না। এটাকে আমি স্যালুট করি। আজকে তোমরা যে অনেক প্লান করে, আগে থেকেই নির্বাচন করে কাজ কর, কিছুটা মনে হবে আপাত দৃষ্টিতে স্বার্থপরের মতো কিন্তু এটার দরকার আছে। কারণ জীবনটা খুব ছোট, যতটা আগে থেকে গুছিয়ে কাজ করা যায়, ততটাই ভালো। তবে আমি খুব উল্টোভাবে প্রথম ছবি করেছি সুলতানের সঙ্গে ৭ বছর লাগিয়ে। 

লোপা : আদম সুরত?

তারেক : হ্যাঁ। কিন্তু আমি আফসোস করি না। আমি এটাকে একটা মধুর ভুল বলব। কারণ ভুলের বাই প্রডাক্ট হিসাবে ছবিটা হয়েছে। সুলতানেরর সান্নিধ্যে থেকে বাংলাদেশকে জেনেছি, জীবনকে চিনেছি, শিল্পকে চিনেছি। তার সংস্পর্শে যেয়েই খামখেয়ালী করে ৭টা বছর কেটেছে, তা থেকে ছবিটা কী হয়েছে জানি না। এর ফলে আমি অনেক বড় একটা বিষয় বুঝতে পেরেছিÑ যা শুধু ওই ছবিতে নয়, পরবর্তী ছবিগুলোতেও কাজে লাগছে।

লোপা : ছবি করার অনেক অভিজ্ঞতা আপনার। কাজ করতে যেয়ে মজাদার কোনো অভিজ্ঞতা?

তারেক : প্রচুর। যখন আদম সুরত করি তখনই তো প্রথম ভুল আমার। ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার! চলচ্চিত্র সংসদের মাধ্যমে তাত্ত্বিক কিছু ফিল্ম ওয়ার্কসপ করেছি। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে কারিগরি কিছুই শিখিনি। অনেক ভুল করেছি, ফলে ওই ভুলটা শোধরাতে সম্পাদনার টেবিলে অনেক সময় লেগেছে। ছবি শেষ হওয়ার পরে বুঝতে পেরেছি, আবার যদি শুরু করতে পারতাম, সুলতানের পিছু পিছু তাহলে একটা ভালো ছবি হত। সেই ব্যাপারটা সবক্ষেত্রেই আমার হয়। পরের ছবিতে আগের ছবির ভুলগুলো শুধরে নেয়ার চেষ্টা করি। আবার নতুন ভুল করি পরের ছবিতে। 

লোপা : তরুণ কিংবা আগামীর নির্মাতাদের উদ্দেশে আপনার কি বলার আছে?

তারেক : তরুণ নির্মাতাদের অনেক বেশি মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে। ধার করা জীবন নিয়ে যে চিত্রনাট্য তা এখন আর মানুষকে টানে না। নিজের জীবনের আশেপাশে তাকালেই সেখানে অনেক গল্প পেয়ে যাবেন তারা। মৌলিক কিছু পেয়ে যাবেন। আর একটা বিষয়, সিনেমার টেকনিক্যাল বিষয়টা অবশ্যই তাদের বুঝতে হবে। ক্যামেরা লাইট মেকআপ থেকে শুরু করে ভিডিও এডিটিং, সবটাই তাকে জানতে হবে। একজন ভালো নির্মাতা হতে গেলে তরুণদের চলচ্চিত্র নির্মাণের সবগুলো দিক সম্পর্কে বেশ ভালোভাবে জানতে হবে। কাজ করতে যেয়ে যদি কখনো মনে হয় এক জায়গায় আটকে গেছি তবে সেখান থেকে বেরুবার চ্যালেঞ্জটা নিজেকেই নিতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা