রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ০৮:১৭ এএম
আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ০৮:১৮ এএম
রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রে স্থাপিত তার ভাস্কর্য। ছবি : প্রবা
প্রতিষ্ঠার ২৫ বছরেও নারী জাগরণের অগ্রদূত মহিয়সী বেগম রোকেয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত ‘রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রে’র কার্যক্রম চালু হয়নি। এতে করে ক্ষোভ বেড়েছে রোকেয়া ভক্তসহ সচেতনমহলের। স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপনের পর এটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু না করে রোকেয়াকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
জানা যায়, রোকেয়ার জীবন কর্ম সর্ম্পকে গবেষণা, তার গ্রন্থাবলির অনুবাদ, প্রচার ও প্রকাশনা, সংস্কৃতি চর্চা এবং স্থানীয় যুবকদের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করার উদ্দেশ্যে স্থানীয় অধিবাসীদের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের খোর্দ্দ মুরাদপুরে ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩ একর ১৫ শতক জমির ওপর ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রে’র ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পরে ২০০১ সালের ১ জুলাই এটির উদ্বোধন করেন তিনি। প্রথমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কেন্দ্রটির দায়িত্বভার গ্রহণ করলেও ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর স্মৃতিকেন্দ্রটি বাংলা একাডেমির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে আবার শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করা হয়। এরপর আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘ জটিলতায় পড়ে স্মৃতিকেন্দ্রটি। বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি। সর্বশেষ বাংলা একাডেমিকে হস্তাস্তর করায় বর্তমানে এ কেন্দ্রে কর্মরত আছেন একজন উপ-পরিচালক, একজন সহকারী গ্রন্থাগারিকসহসহ ৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। বর্তমানে স্মৃতিকেন্দ্রটি পড়ে আছে অযত্ন আর অবহেলায়। অপরদিকে ২০০৪ সালের ৫ আগস্ট প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রোকেয়ার জন্মভিটাটি সংরক্ষিত পুরার্কীতি হিসেবে ঘোষণা করে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সেই ঘোষণার পর রোকেয়ার জন্মভিটাটি সংরক্ষণ কেবল একটি সাইনবোর্ড স্থাপনেই সীমাবদ্ধ রেখেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।
রোকেয়ার জন্মভিটা ও স্মৃতিকেন্দ্র সরেজমিনে দেখা যায়, ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবসকে ঘিরে জন্মভিটার সামনের রাস্তা সংস্কার করা হয়েছে। রোকেয়ার জন্মভিটার ধ্বংসাবশেষ অযত্ন আর অবহেলায় নিশ্চিহ্নের পথে। শ্যাওলা জমেছে ধ্বংসাবশেষের ইটগুলোতে। তবে রোকেয়ার বাড়ির একটি জানালাসহ দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ এখনও টিকে রয়েছে। রোকেয়া দিবস ঘিরে জন্মভিটায় পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেছে উপজেলা প্রশাসন। রোকেয়ার জন্মভিটার পাশে স্মৃতিকেন্দ্রের গোছানো পরিবেশ। পাকা রাস্তা, রেস্ট হাউজ, মিলনায়তন, গবেষণাকক্ষ, সেমিনার কক্ষ, লাইব্রেরিসহ সব কক্ষই তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। স্মৃতিকেন্দ্র ঢুকতেই হাতের বাঁ-পাশে চতুর্ভূজ আকৃতির শোভাবর্ধনকারী গাছে আবৃত্ত একটি স্থানে জ্ঞানের প্রদীপ বই হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে রোকেয়ার ভাস্কর্য। দর্শনার্থীরা এসে সেখানে ছবি তুলে শান বাঁধানো পুকুর, স্মৃতিকেন্দ্রের চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে ঘুরে চলে যাচ্ছেন।
স্মৃতিকেন্দ্রে আসা রংপুর নগরীর কলেজ শিক্ষার্থী রাশেদ রাব্বী বলেন, যত্ন না থাকায় রোকেয়ার জন্মভিটা ধংসাবশেষ আজ নিশ্চিহ্নের পথে। রোকেয়াকে গবেষণার জন্য স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও সেটিরও কোনো কার্যক্রম নেই। সরকার সারাদেশে এত উন্নয়ন করলেও রোকেয়ার স্মৃতিকেন্দ্র ও জন্মভিটার নেই উন্নয়ন। স্মৃতিকেন্দ্রকে অচল রেখে রোকেয়াকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।
স্থানীয় অধিবাসী নাসিমা খাতুন বলেন, ‘হামরা তো ছোট থ্যাকি দেখি আসতোছি অকেয়ার (রোকেয়ার) বাড়ির কোন উন্নতি নাই। বাড়ির ইটগুল্যা নষ্ট হয়া যাওছো। বরাদ্দ যদি আসিয়াও থ্যাকে, সউগ ন্যাতা-খ্যাতার প্যাটোত চলি যায়। এটে কোন উন্নতি হয় না।’
শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম হৃদয় বলেন, ‘রোকেয়া দিবস আসলেই সরব হয় স্মৃতিকেন্দ্র। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। স্মৃতিকেন্দ্র সাজসজ্জার পাশাপাশি মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় এখানে। ৩ দিন পেরিয়ে গেলেই আবারও ভূতুরে পরিবেশ স্মৃতিকেন্দ্রে।’
স্মৃতিকেন্দ্রের কক্ষগুলো তালাবদ্ধ থাকে প্রায়। ছবি : প্রবা
পায়রাবন্দ রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের কার্যক্রম সচল নিয়ে শুধু আশ্বাসই মেলে, বাস্তবায়ন আর হয় না। আক্ষেপ থেকে আমি বলতে চাই এ স্মৃতিকেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হোক। অযথা এখানকার জনবলকে জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে বেতন দিচ্ছে সরকার। অথচ তাদের কোন কাজ নেই এখানে। আর যদি সরকার মনেই করে এটি চালু রাখবে তবে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হোক। আমাদের স্বপ্ন ছিল শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকবে রংপুরের বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র। দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখানে রোকেয়াকে নিয়ে গবেষণা করতে আসবে শিক্ষার্থীরা। বছর জুড়ে প্রশিক্ষণ-সাংস্কৃতিক চর্চা হবে। বছরজুড়ে দেশের খ্যাতিমান মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের আনাগোনা থাকবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আমাদের অধরাই থেকে গেল।’
রংপুর জেলার নবাগত জেলা প্রশাসক ড. চিত্রলেখা নাজনীন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান সরকার নারী উন্নয়নের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এসডিজিতেও নারী উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। আমি যেহেতু রংপুরে সদ্য যোগদান করেছি। স্মৃতিকেন্দ্রটি চালু ও রোকেয়ার জন্মভিটা সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে আমার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকবে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রোকেয়া দিবস উপলক্ষে রোকেয়ার জন্মভিটায় তিন দিন ব্যাপী নানা কর্মসূচি বরাবরের মতই পালিত হচ্ছে।