× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

একটি চড়ুই ও একজন সলিম আলী

আ ন ম আমিনুর রহমান

প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৪ ১৬:১০ পিএম

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৪ ১৬:২৪ পিএম

রাজস্থানের সারিস্কা টাইগার রিজার্ভে একটি হলদে-গলা চড়ুই। ছবি : লেখক

রাজস্থানের সারিস্কা টাইগার রিজার্ভে একটি হলদে-গলা চড়ুই। ছবি : লেখক

ভারতের বন্য প্রাণী ও পাখি পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে ছয়জনের টিমে রাজস্থান গেলাম ২০২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। আট ফেব্রুয়ারি সকালে জয়পুর বিমানবন্দরে নেমে পাশের একটি হোটেল উঠলাম। হোটেলে লাগেজপত্র রেখে ক্যামেরা নিয়ে রওনা হলাম রাজস্থানের বিখ্যাত সারিস্কা টাইগার রিজার্ভের উদ্দেশে। হোটেল থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরের এই সংরক্ষিত বনে পৌঁছতে দুপুর দেড়টা বেজে গেল। এটি ভারতের রাজস্থানের আলওয়ার জেলায় অবস্থিত। প্রায় ৮৮১ বর্গকিলোমিটারের বিশাল বনটি কাঁটাওয়ালা শুষ্ক জঙ্গল, শুষ্ক পর্ণমোচী, তৃণভূমি ও পাথুরে পাহাড়ের সমন্বয়ে গঠিত। একসময় এটি আলওয়ার রাজ্যের শিকারের ক্ষেত্র ছিল, যা ১৯৫৮ সালে সংরক্ষিত বনে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে এখানে ২০টির মতো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাস।

দুপুর ঠিক ২টায় জিপসি জিপে ছয় অভিযাত্রী সারিস্কা বন্য প্রাণী অভিযান শুরু করলাম। বনের বিভিন্ন ট্র্যাকে প্রায় দু ঘণ্টা ঘুরে ছয় প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, এক প্রজাতির কুমির ও ২২ প্রজাতির পাখির দেখা পেলাম। ওদের সুন্দর সুন্দর সব ছবি তুললাম। তবে বাঘ মামার দেখা পেলাম না। বিকাল ৪টা ২২ মিনিটে বনের ঠিক মাঝামাঝি একটি বাবলা গাছে ছোট্ট একটি পাখি দেখলাম। প্রথম দেখায় পাখিটিকে বাবুই বলে মনে হলো। চলন্ত জিপ থেকে সমানে ক্লিক করে গেলাম। খানিক পরে জিপ থামিয়ে ছবিটি জুম করে দেখতেই ওর গলার হলুদ দাগটি চোখে পড়ল। পাখিটি তখনও জিপের কাছাকাছি ছিল। কাজেই ওর আরও কিছু ছবি তুলে নিলাম। পাখিটিকে কেমন যেন চেনাচেনা লাগল। 

হোটেলে ফিরে রাতে যখন ছবিগুলো ল্যাপটপে আপলোড করলাম তখন গলায় হলুদ দাগওয়ালা চড়ুইটিকে চিনতে মোটেও অসুবিধা হলো না। এই সেই চড়ুই, যাকে মারার কারণেই এই উপমহাদেশ পেয়েছিল এক জগদ্বিখ্যাত পক্ষীবিদ বার্ডম্যান ড. সলিম ময়জুদ্দিন আব্দুল আলী বা সলিম আলীকে। কাজেই সলিম আলীর সেই চড়ুইয়ের ছবি তুলতে পেরে মনটা আনন্দে ভরে উঠল।

সলিম আলীর বয়স যখন দশ বছর তখন তার মামা আমিরুদ্দিন তাকে একটি এয়ারগান উপহার দেন। একদিন সেই এয়ারগান দিয়ে তিনি একটি চড়ুই পাখি শিকার করেন। কিন্তু মৃত চড়ুইটি হাতে নিয়ে তিনি লক্ষ করলেন যে, সেটি কোনো সাধারণ চড়ুই নয়। ওর গলায় রয়েছে হলুদ রঙের দাগ। তিনি তার মামাকে মৃত চড়ুইটি দেখালেন। আমিরুদ্দিন ছিলেন বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির একজন সদস্য। তিনি তখন শিশু সলিম আলীকে সোসাইটির অনারারি সচিব ডব্লিউ এস মিলার্ডের কাছে নিয়ে গেলেন পাখিটির সঠিক পরিচয় জানার জন্য। মিলার্ড পাখিটিকে হলুদ-গলা চড়ুই বলে শনাক্ত করলেন এবং তাকে সোসাইটির জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রচুর মমি করা পাখি দেখালেন। এতে শিশু সলিম আলীর মনে পাখির প্রতি আগ্রহ জন্মাল। তিনি তাকে বেশ ক’টি পাখির বইও ধার দিলেন, যাতে তিনি এগুলো পড়ে পাখি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে পারেন। তিনি তাকে পাখির চামড়া কাটা ও পাখি সংরক্ষণের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাবও দিলেন। সেই থেকে শিশু সলিম আলী বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন। আর এভাবেই একসময় তিনি হয়ে উঠলেন এই উপমহাদেশের বিখ্যাত পক্ষীবিদ বার্ডম্যান ড. সলিম আলী।

সলিম আলী ১৮৯৬ সালের ১২ নভেম্বর বোম্বের এক সোলাইমানি বোহারা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম জইনুদ্দিন আব্দুল আলী ও মায়ের নাম জিনাতুন্নিসা। তিনি বাবা-মায়ের নবম ও শেষ সন্তান। তার বয়স যখন মাত্র এক বছর তখন তার বাবা এবং তিন বছর বয়সে মা মারা যান। এরপর অন্যান্য ভাইবোনের সঙ্গে মামা আমিরুদ্দিন ও নিঃসন্তান খালা হামিদা বেগম তাকে লালনপালন করে বড় করে তোলেন।

জগদ্বিখ্যাত পক্ষীবিদ বার্ডম্যান ড. সলিম ময়জুদ্দিন আব্দুল আলী। 

সলিম আলী তার আত্মজীবনী, ‘দ্য ফল অব এ স্প্যারো’তে, হলুদ-গলা চড়ুই শিকারের ঘটনাটিকে তার জীবনের মোড় ঘোরানোর সন্ধিক্ষণ বলে উল্লেখ করেছেন। যার কারণে তিনি পক্ষীবিদ্যার প্রতি অনুরাগী হয়েছিলেন। সে সময় এই উপমহাদেশের পাখি নিয়ে ব্রিটিশরাই মূলত মাথা ঘামাতেন। ড. সলিম আলীই প্রথম ভারতীয়, যিনি ভারতে পদ্ধতিগত পাখি জরিপ করেন। তার মতো ভারতীয়র জন্য সে সময় এটা একটা অস্বাভাবিক ব্যাপারই ছিল।

মাত্র দশ বছর বয়স থেকেই তিনি ডায়রি লিখতেন। তার প্রথম দিকের নোটগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ছিল গুলি করে পুরুষ চড়ুইকে মারার পর জোড়ভাঙা স্ত্রী চড়ুইয়ের নতুনভাবে জোড় বাঁধার পর্যবেক্ষণ। যা হোক, ক্ষণজন্মা সলিম আলী সেই ব্যক্তি যিনি উপমহাদেশের পক্ষীবিদ্যায় ব্রিটিশদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করেন। তিনি বেশ কিছু নামকরা ব্রিটিশ পক্ষীবিদের পর্যবেক্ষণ ও লেখায় ভুল ধরিয়ে দেন।

স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর মাধ্যমে পাখি সংরক্ষণে সলিম আলী যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর যখন ১০০ বছরের পুরোনো বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল, তখন সলিম আলীই জওহরলাল নেহরুর কাছ থেকে অনুদান এনে সোসাইটিকে রক্ষা করেছিলেন। তিনি রাজস্থানের ভরতপুর পক্ষী অভয়ারণ্য ও রঙ্গনাথিট্টু পক্ষী অভয়ারণ্য তৈরি এবং সাইলেন্ট ভ্যালি নাশনাল পার্ক রক্ষা করেন।

এই উপমহাদেশে পেশাদার ও অপেশাদারভিত্তিক পাখি পর্যবেক্ষণ ও পক্ষীবিদ্যা অধ্যয়নকে জনপ্রিয় করতে সলিম আলীর মতো অবদান আর কারও নেই। তিনি অসংখ্য জার্নাল নিবন্ধ, জনপ্রিয় ও শিক্ষণীয় বই এবং ফিল্ডগাইড লিখেছেন। তার রচিত বইয়ের মধ্যে ‘বুক অব ইন্ডিয়ান বার্ড’ এখনও উদীয়মান পক্ষীবিদদের পাথেয়। ভারতের মতো বাংলাদেশেও তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। সে কারণেই পাখি পর্যবেক্ষণে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অনেকেই এদেশের সলিম আলী বলে অভিহিত করেন। ১৯৮৭ সালের ২০ জুন ৯১ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তবে এত খ্যাতিমান ও কীর্তিমান হওয়া সত্ত্বেও পাখির প্রতি তার অনুরাগ ও কৌতূহল দশ বছর বয়সে যেমন ছিল, বৃদ্ধ বয়সেও তার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

লেখক : পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা