ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:৩৪ পিএম
চলতি বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, এটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আমরা যখন অবিভক্ত ভারতের অংশ ছিলাম তখন ১৯১৩ সালে বিশেষ করে তার ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য সাহিত্যে নোবেল লাভ করেছিলেন।
১৯১৩ থেকে ২০২৪, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরবর্তী একশ এগারো বছর পর দক্ষিণ কোরিয়ার একজন সাহিত্যিক সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। যিনি এই সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন, তার নাম হান কাং। তার বয়সও কম, মাত্র ৫৩ বছর। তিনি এ বছর নোবেল পাবেন, এমনটা আমাদের ধারণায় ছিল না। গতবার যেমন চীনের চ্যান শুইয়ের কথা বলা হয়েছিল, এবার ভেবেছিলাম হয়তো তিনিই পাবেন। কিংবা নগগি ওয়া থিয়াঙ্গু বা হারুকি মুরাকামি পাবেন নোবেল। তারা কেউ পায়নি, পেয়েছেন কোরিয়ান সাহিত্যিক হান কাং। কিন্তু আমাদের আশা পূর্ণ হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, এবার এশিয়াতেই আসবে সাহিত্যের নোবেল।
হান কাং খ্যাতি লাভ করেছেন ২০১৬ সালে। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ভেজিটারিয়ান’, ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার লাভ করে। যার মাধ্যমে পৃথিবীজুড়ে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। সবাই জানতে পারল, দক্ষিণ কোরিয়ান একজন ভালো লেখিকা আছেন। এভাবেই মূলত তার বিশ্বজয়ের যাত্রা শুরু। হান কাং উপন্যাস লেখেন, ছোটগল্প লেখেন, কবিতাও লেখেন। নোবেল কমিটি বলেছে, তার ভাষার মধ্যে একটা কাব্যিকতা রয়েছে।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে হান কাংয়ের নাম ঘোষণার পর তার দুটি উপন্যাসের কিছু অংশ পড়েছি। একটি হলো ‘দ্য ভেজিটারিয়ান’, অন্যটি হলো ‘মাই ওমেনস ফ্রুটস’।
অল্প পাঠে অনুমান করতে পারি, তার ভাষার মধ্যে এক ধরনের প্রাঞ্জলতা রয়েছে, সাবলিলতা রয়েছে। তার সাহিত্যের বিষয়বস্তুও জীবনের দুঃখী, অতৃপ্ত তরুণীদের নিয়ে। ‘দ্য ভেজিটারিয়ান’ উপন্যাসের কথাই যদি বলি, যার জন্য তিনি বুকার পুরস্কার পেয়েছেন। উপন্যাসটি দক্ষিণ কোরিয়ান একজন তরুণী ইয়ং হাইয়ের গল্প। ইয়ং হাই বিবাহিতা। কিন্তু সে তার দাম্পত্য জীবনে অসুখী। একদিন সে দুঃস্বপ্ন দেখে, তাকে একটি জন্তু আক্রমণ করেছে। এরপর সে প্রায় প্রতিদিনই একই স্বপ্ন দেখতে থাকে। যা তার মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। সে ভাবতে থাকে, সমাজের কাছ থেকে তার আর পাওয়ার কিছু নেই। সে ব্রেসিয়ার পরা বন্ধ করে দেয়। স্বামীর সঙ্গে যৌনমিলন থেকেও বিরত থাকে। খাওয়াদাওয়া একেবারে কমিয়ে দেয়। মাছ, মাংস সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে ভেজিটারিয়ান হয়ে যায়। এমনকি নিজের যে পরিবার, পরিবারের সব সদস্যের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও বন্ধ করে দেয়। ইয়ং হাইয়ের অবস্থার এতটাই পরিবর্তন হয় যে, তার পরিবারের সবাই এই সমস্যার সুরাহা চায়। এ অবস্থায় তার বাবা একদিন, জোর করে তার মুখের মধ্যে একদলা শূকরের মাংস ঢুকিয়ে দেয়। এ ঘটনায় ইয়ং হাই দারুণ রাগান্বিত হয় এবং প্রতিশোধ হিসেবে রান্নাঘর থেকে একটা চাকু নিয়ে তার বাহুমূলে ঢুকিয়ে দেয়। এতে অনেক রক্তপাত হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে সে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার মধ্যে উন্মাদনা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত তার ঠাঁই হয় এটা মনোচিকিৎসালয়ে। একদিন তার বোন ইন হাই তাকে দেখতে যায়। তখন ইয়ং হাই বোনের কানে ফিসফিস করে বলে, আমার খাওয়াদাওয়ার ঝামেলা আর নেই। আমার এখন প্রয়োজন শুধু একটু সূর্যের আলো।
‘দ্য ভেজিটারিয়ান’ উপন্যাসের যতদূর বলা হলো, তাতে পরিষ্কার বোঝা যায়Ñ হান কাংয়ের গল্প যদিও বাস্তবের মধ্যে প্রোথিত, কিন্তু এর মধ্যে একটা আদিভৌতিক বা অতিজাগতিক বিষয়ও আছে। ‘মাই ওমেনস ফ্রুটস’-এর কথাও যদি বলি, সেখানে দেখতে পাই, এক ব্যক্তির স্ত্রী গাছে পরিণত হয়। এবং ওই স্বামী তার স্ত্রীকে একটা টবে রোপণ করে ব্যালকনিতে রাখে। এর মাধ্যমে বুঝতে পারি হান কাংয়ের চিন্তার জগৎ ভিন্ন ধরনের।
হান কাংয়ের বাবাও একজন সাহিত্যিক ছিলেন। তার শৈশব কেটেছে দৈন্যদশায়। এর মধ্যে তিনি একটা সময় লিখতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে উল্লেযোগ্য সংখ্যক গল্প, উপন্যাস, কবিতা তিনি লিখেছেন। এবং মাত্র ৫৩ বছর অর্থাৎ বেশ অল্প বয়সেই তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আমরা তাকে অভিনন্দন জানাই। আমরা আশা করি, তার কাছ থেকে আরও নতুন ধরনের সাহিত্যকর্ম লাভ করব।