প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২২ ১১:৩১ এএম
আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২২ ১৪:৩২ পিএম
হাসান আজিজুল হক। ফাইল ছবি
ষাটের দশকে বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্পে নিজস্ব গদ্যরীতি ও মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গিতে তিনি আলোড়ন তুলেছিলেন বাংলার সাহিত্য অঙ্গনে। বাঙালির নিয়ত জীবনসংগ্রাম তার ছোটগল্প ও উপন্যাসে প্রধানতম অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে বারবার। রাঢ়বঙ্গের লোকজীবন ও উৎসবকে বহু গল্পের পটভূমি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন হাসান আজিজুল হক।
হাসান আজিজুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার। ২০২১ সালের এই দিনে না-ফেরার দেশে চলে যান তিনি।
হাসান আজিজুল ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোহাম্মদ দোয়া বখশ্ এবং মাতা জোহরা খাতুন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজশাহীতে কাটিয়েছেন।
ছাত্রজীবনে পাকিস্তানে স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে রাজপথে নামেন হাসান আজিজুল হক। প্রথম যৌবনেই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এ কারণে বিভিন্ন সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতন ভোগ করেন।
১৯৫৮ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে দর্শনে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। ১৯৬০ সালে স্নাতকোত্তর করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়; কিন্তু বিদেশের পরিবেশ ভালো না লাগায় অধ্যয়ন শেষ না করেই দেশে ফিরে আসেন।
১৯৬০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি রাজশাহী সিটি কলেজ, সিরাজগঞ্জ কলেজ, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ এবং সরকারি ব্রজলাল কলেজ শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৭৩-এ তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
সেখানে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ৩১ বছর শিক্ষকতা করেন। ২০০৯-এ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদের জন্য মনোনীত হন এবং দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪-এর আগস্টে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন।
হাসান আজিজুল হকের প্রথম লেখা ছাপা হয় মিসবাহুল আজীমের সম্পাদনায় প্রকাশিত ভাঁজপত্র চারপাতা-য়। তখন তিনি রাজশাহী কলেজের ছাত্র। ১৯৬০ সালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় তার গল্প ‘শকুন’ প্রকাশিত হয়।
১৯৫৬ সালে নাসির উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ‘মুকুল’ পত্রিকায় তার ‘মাটি ও পাহাড়’ শীর্ষক একটি গল্প প্রকাশিত হয়। ১৯৬০ সালে ‘পূর্বমেঘ’ পত্রিকায় ‘একজন চরিত্রহীনের স্বপক্ষে’ প্রকাশিত হওয়ার পরই তিনি একজন ব্যতিক্রমী কথাশিল্পী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
এ সময় তিনি পূবালী, কালবেলা, গণসাহিত্য, ছোটগল্প, নাগরিক,পরিক্রম, কণ্ঠস্বর, পূর্বমেঘ প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন।
১৯৬৩ সালে সুহৃদ নাজিম মাহমুদের সহযোগিতায় সন্দীপন গোষ্ঠী নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে যুক্ত হন হাসান আজিজুল হক। তিনি এ সময় সুহৃদ নাজিম মাহমুদের সঙ্গে যুগ্মভাবে সাহিত্য পত্রিকা সন্দীপন সম্পাদনা করেন।
হাসান আজিজুল হকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে : সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য, আত্মজা ও একটি করবী গাছ , জীবন ঘষে আগুন, নামহীন গোত্রহীন, পাতালে হাসপাতালে, নির্বাচিত গল্প, আমরা অপেক্ষা করছি, রাঢ়বঙ্গের গল্প, রোদে যাবো, হাসান আজিজুল হকের শ্রেষ্ঠগল্প, মা মেয়ের সংসার, বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প।
প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : কথাসাহিত্যের কথকতা, চালচিত্রের খুঁটিনাটি, অপ্রকাশের ভার, সক্রেটিস, অতলের আধি, কথা লেখা কথা, লোকযাত্রা আধুনিক সাহিত্য, একাত্তর : করতলে ছিন্নমাথা, ছড়ানো ছিটানো, কে বাঁচে কে বাঁচায়, বাচনিক আত্মজৈবনিক, চিন্তন-কণা, রবীন্দ্রনাথ ও ভাষাভাবনা। উপন্যাস রয়েছে আগুনপাখি, সাবিত্রী উপাখ্যান, শামুক।
হাসান আজিজুল হক ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৯৯ সালে একুশে পদকে ও ২০১৯-এ স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। এই অসামান্য গদ্যশিল্পী তার সার্বজৈবনিক সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি লাভ করেন।