মিস ওয়ার্ল্ড ২০২৫
আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৫ ১৭:৩২ পিএম
বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। মন খারাপ তো বটেই, মন ভালো করা খুশির খবর শুনলেও আমরা বেশ আবেগী হয়ে পড়ি। দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে যখন বাংলাদেশের নামটা বারবার উচ্চারিত হয় তখন বোধহয় আমাদের ভালোলাগার মাত্রাটা আরও বেড়ে যায়। এ বছর মিস ওয়ার্ল্ডে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন আকলিমা আতিকা কনিকা। তিনি সম্প্রতি বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সুন্দরী প্রতিযোগিতা মিস ওয়ার্ল্ড ২০২৫-এ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। মঙ্গলবার (৩ জুন) ঢাকায় আজরা মাহমুদ ট্যালেন্ট ক্যাম্পের অফিসে এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন সাংবাদিক, শুভানুধ্যায়ী ও সহযোগীদের।
আজরা মাহমুদ ট্যালেন্ট ক্যাম্পের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় এই সংবাদ সম্মেলন। কনিকার মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে শুরু করে বৈশ্বিকমঞ্চে অংশগ্রহণের এই অভিযাত্রাকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরা হয় এই আয়োজনে। কনিকা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জানান তাঁর প্রস্তুতির কঠোরতা, আবেগঘন মুহূর্ত আর স্মরণীয় সব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে।
আজরা মাহমুদ ট্যালেন্ট ক্যাম্পের অফিসে আজরা মাহমুদের সাথে আকলিমা আতিকা
কীভাবে পৌঁছালেন বিশ্বমঞ্চে
২০২৩ সালে আয়োজিত মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হয়েছিলেন আকলিমা। সেই সাথে অংশ নিয়েছিলেন ফেস অব বাংলাদেশ হিসেবে ফেস অব এশিয়ার মূল পর্বে। সেবার দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়েই তার মনে হয়েছিল, আমাদের আর আন্তর্জাতিক মডেলদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ওরাও ভালো কাজ করে, আমরাও ওদের চেয়ে পিছিয়ে নেই। এ বছর যখন আজরা মাহমুদকে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের লাইসেন্স দেওয়া হয়, তখন মূল প্রতিযোগিতা শুরু হতে আর সময় ছিল মাত্র ১০ দিন। আজরা মাহমুদ বিশ্বাস করেছেন, এ প্রতিযোগিতার জন্য আকলিমাই সেরা। এরপর শুরু হয় যাওয়ার প্রস্তুতি।
খুব অল্প সময় পেয়েছিলেন প্রতিযোগিতায় যাওয়ার জন্য। যাওয়ার আগে পোশাকের নকশা করা, কতগুলো পোশাক নিতে হবে সেগুলো ঠিক করা, ছবি ও ভিডিও পাঠানো, নাচের প্র্যাক্টিস করা সবই করেছেন অল্প সময়ের মধ্যে। তবে প্রতিটি কাজে আজরা মাহমুদ ছিলেন তার ছায়াসঙ্গী হয়ে, একথা বলেছেন বারবার।
প্রতিযোগিতায় যেয়েও তার মধ্যে কিছু ভয় তো কাজ করছিলই। তবে এখানেও তার উপর মুকুট জিততেই হবে এ ধরনের প্রেশার কখনোই তাঁকে দেয়া হয়নি দলের পক্ষ থেকে। বাংলাদেশকে যেন বিশ্বের মানুষ চিনে, মনে রাখে, আকলিমাকে যেন মনে রাখে – এই দায়িত্বটাই প্রাধান্য পেয়েছিল। প্রতিটি পোশাকে যখন ‘বাংলাদেশ’ নামের নেমপ্লেট তার সাথে ছিল, প্রতিবারই তিনি আবেগপ্রবণ হয়েছেন।
কনিকা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেন, ‘আমি যখন ঐ মঞ্চে পা রাখি, তখন আমি শুধু একজন প্রতিযোগী ছিলাম না— আমি ছিলাম বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের প্রতিনিধি। প্রতিটি পদক্ষেপ, হাসি, শব্দে আমি আমার জাতির গর্ব বহন করেছি’।
যদিও তিনি বিজয়ীর মুকুট জিততে পারেননি, তবুও কনিকার আচরণ, স্বতঃস্ফূর্ততা আর দৃঢ় উপস্থিতি দেশ-বিদেশের দর্শক ও বিচারকদের মন জয় করেছে। এই প্রতিযোগিতা প্রমাণ করেছে, জয় মানেই কেবল পুরস্কার নয়— জয় মানে আত্মপরিচয়, অধ্যাবসায় আর হৃদয়ের শক্তি।

প্রশ্নোত্তর পর্ব ও সম্মাননা
অনুষ্ঠানের প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন আনন্দের সাথে। মিস ওয়ার্ল্ড–এ কনিকার অংশগ্রহণকে সম্ভব করে তুলতে যাঁরা অবদান রেখেছেন তাঁদেরও এই অনুষ্ঠানে স্বীকৃতি জানানো হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এমবিআইটি (মিস বাংলাদেশ টিম ইন ট্রেনিং)— যাঁরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের প্রস্তুতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন। কনিকাকে তৈরি করতে তাঁরাও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
ভূয়সী প্রশংসা পাওয়া পোশাকের নকশাকার রাইসা আমিন শৈলী
অনুষ্ঠানে সম্মাননা দেওয়া হয় কনিকার পোশাক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত প্রধান ফ্যাশন ডিজাইনার মেহরুজ মুনিরকে। এছাড়াও সম্মাননা জানানো হয় অন্যান্য প্রতিভাবান ডিজাইনার রাইসা আমিন শৈলী, ফারদিন বায়েজিদ, বিশ্বজিৎ ও তৃষাকে; তাঁরা কনিকার পোশাক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কনিকাকে পরিপাটি করে তোলা ক্রিয়েটিভ টিমও। এঁদের মধ্যে ছিলেন ফটোগ্রাফার নাইমুল ইসলাম, সিনেমাটোগ্রাফার আশরাফুজ্জামান শেখর, এডিটর পলাশ বিশ্বাস এবং কোরিওগ্রাফার আসাদ খান।
ফ্যাশন ডিজাইনার বিশ্বজিৎ, তৃষা, মেহরুজ মুনির ও ফারদিন বায়েজিদ (উপর থেকে নিচে)
কনিকার স্টাইলিস্ট ও ইমেজ আর্কিটেক্ট হিসেবে পুরো সময় ছিলেন এফা তাবাসসুম। তাঁর নিখুঁত পরিকল্পনায় কনিকার প্রতিটি লুক ছিল আকর্ষণীয়। কনিকার উপস্থিতির মধ্যে দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের সম্মান ও সাংস্কৃতিক গর্বের অভিব্যক্তিকে প্রতীয়মান করার ঐকান্তিক চেষ্টা করেছেন এফা। এই অনুষ্ঠানে তাঁকেও সম্মানিত করা হয়।
‘এই যাত্রা কখনোই আমার একার ছিল না’, বলেন কনিকা, ‘এই প্রয়াস পূর্ণতা পেয়েছে আমার মেন্টর, সৃজনশীল দল, বন্ধু আর আমার ওপর যাঁরা আস্থা রেখেছেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। আজ আমার এই উপস্থিতিতে বলতে গেলে আপনাদের সবারই প্রতিচ্ছবিই প্রতীয়মান হয়েছে।’
লাইফস্টাইল জগতে আকলিমার এই যাত্রা কীভাবে অবদান রাখতে পারে তা নিয়ে কথা বলছেন জনপ্রিয় লাইফস্টাইল সাংবাদিক শেখ সাইফুর রহমান
পড়াশোনা ও কাজ
আকলিমা পড়ালেখা করছেন শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে ফ্যাশন ম্যানুফ্যাকচারিং নিয়ে। বাবা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। বাবার পেশার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁকে থাকতে হয়েছে। বড় ভাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, জার্মানিতে চাকরি করেন।
বিশ্বমঞ্চ ঘুরে আসলেও ছোটবেলায় আকলিমার আত্মবিশ্বাস খুব কম ছিল। স্কুলে পাশেরজনের উত্তর দেখে দেখে লিখতেন, কারণ তার মনে হতো তার নিজের লেখা উত্তর হয়ত ভুল। কারণ ছোটবেলাতে তার সেই আত্মবিশ্বাস বাড়তেই দেয়া হয়নি। কলেজে ওঠার আগ পর্যন্ত ভেবেছেন নিজেকে দিয়ে কিছুই হবে না। কলেজে উঠে যখন হোস্টেলে থাকা শুরু করলেন তখন তার কাজের প্রশংসা হওয়া শুরু হলো বন্ধুদের মাঝে। বই পড়া, ছবি আঁকা, গান গাওয়াতে ছিল ভীষণ আগ্রহ। সেই থেকে নিজেকে ভালোবাসার শুরু।
আকলিমা জানাচ্ছেন বিশ্বমঞ্চের অভিজ্ঞতা
যখন থেকে নিজেকে ভালোবাসলেন, বুঝলেন আশেপাশের অনেকেই তার মতো অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা নিজেরাই জানে না তাঁরা কততা অসাধারণ। এরপর আকলিমা কোর্স করেন হিউম্যান সাইকোলজির উপর। ব্যক্তিগতভাবে পড়াশোনা করে চাইল্ড ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে বিশেষ শিশুদের আঁকা ছবি দিয়ে তাঁরা পোশাক, ব্যাগ ইত্যাদি ডিজাইন করতেন। এরপর মিস বাংলাদেশ-ইন ট্রেনিংয়ের (এমবিআইটি) সঙ্গে যুক্ত হন। এখন ৬-১২ বছর বয়সী শিশুদের মা-বাবাদের সন্তান পালন বিষয়ক কোর্স করাচ্ছেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে ‘হিলার’হিসেবে প্রায় ৫০০ তরুণ-তরুণীর মনের কথাও শুনেছেন।
এদিন নিজের ভবিষ্যত ভাবনার কথাও জানিয়েছেন কনিকা। তিনি বলেন, আমি এখন আমার দুটি প্রকল্প “Beauty With A Purpose” এবং “Young Mind Matters”–এ মনোযোগ দেব। এই দুটি প্রকল্প, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও এর উন্নয়নে কাজ করে থাকে। এই প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে আমি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নানা প্রচারণা চালাব। পাশাপাশি নতুন উদ্যোগও নিব; যাতে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চলার পথকে সুগম হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চের আলো থেকে দেশে ফিরে, এই অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির আয়োজন কেবলই ‘ঘরে ফেরা’ নয়; বরং কোন সন্দেহ নেই, এটা সম্মিলিত স্বপ্নপূরণের উদযাপন। কনিকার গল্প আজ বাংলাদেশের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। আবারও প্রমাণিত হলো লক্ষ্য, প্রস্তুতি আর আবেগ থাকলে বিশ্বমঞ্চও জয় করা সম্ভব।
মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টর আজরা মাহমুদ বলেন, ‘আকলিমার জন্য আমি ভীষণ গর্বিত। তিনি বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের প্রতীক—সাহসী, সহানুভূতিশীল এবং আন্তর্জাতিক মনোভাব–সম্পন্ন’।