অরুপ রতন, বগুড়া
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৫ ১০:০১ এএম
আপডেট : ১৮ মে ২০২৫ ২১:৪৭ পিএম
বগুড়ার কৈগাড়ি পূর্বপাড়ায় নিজ বাড়িতে মাংসের আচার তৈরিতে ব্যস্ত মাসুমা ইসলাম
সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় একজন গৃহবধূ কীভাবে সফল নারী উদ্যোক্তায় রূপ নিতে পারেন তার জীবন্ত উদাহরণ বগুড়ার কৈগাড়ি পূর্বপাড়ার মাসুমা ইসলাম। করোনা মহামারিতে স্বামীর চাকরি চলে যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরেন তিনি। বর্তমানে তিনি শুধু গৃহিণী নন, বরং আচার, ঘি ও সেমাই তৈরিতে দেশ-বিদেশে পরিচিত একটি নাম। আজ তার মাসিক বিক্রির পরিমাণ প্রায় আড়াইশ কেজি এবং আয় দুই লক্ষাধিক টাকা।
একেবারেই শূন্য থেকেই শুরু করেছিলেন মাসুমা ইসলাম। পাঁচ বছর আগে করোনাকালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্বামীর চাকরি চলে গেলে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। একসময় শিশুকন্যার মাটির ব্যাংকে জমা ৩০০ টাকা হাতে নিয়েই শুরু করেন ছোট পরিসরে ব্যবসা। প্রথমে অনলাইনে কাপড় বিক্রি শুরু করলেও লাভের মুখ দেখেননি। কিন্তু হাল ছাড়েননি। শাশুড়ির মুখে শোনা কোরবানির মাংস সংরক্ষণের পুরোনো কৌশল মাথায় রেখে শুরু করেন মাংসের আচার তৈরি।
গরুর মাংস দিয়ে বানানো প্রথম ব্যাচের আচার নিজের ফেসবুক পেজ ‘আর এম ফুড কর্নার’-এ পোস্ট করার পরই আসে ব্যাপক সাড়া। একের পর এক অর্ডার, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রবাসেও ছড়িয়ে পড়ে মাসুমার আচার। এখন নিয়মিতভাবে ভারত, আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, লন্ডন, সিঙ্গাপুর, দুবাই, সৌদি আরবসহ ১৭টি দেশে পৌঁছে যাচ্ছে তার তৈরি গরু, খাসি ও মুরগির মাংসের আচার।
প্রতি মাসে ২০০ থেকে ৩০০ কেজির বেশি গরুর মাংস ছাড়াও খাসি, মুরগি, রসুন, জলপাই ও বিভিন্ন মৌসুমি ফলের আচার এবং ঘি ও লাচ্ছা সেমাই বিক্রি করেন তিনি। আচার তৈরিতে ব্যবহৃত হয় প্রিমিয়াম মানের মাংস, যেটি হাড় ও চর্বি ছাড়িয়ে পরিষ্কার করে সিদ্ধ করা হয়। এরপর সরিষার তেলে, নিজের বিশেষ সিক্রেট মসলা দিয়ে ভাজা হয় মাংস। মাসুমার আচার তাই ভিন্ন স্বাদের, স্বাস্থ্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী।
নারী উদ্যোক্তা মাসুমা ইসলাম বলেন, মাসুমা আক্তার বগুড়া শহরের কৈগাড়ি পূর্বপাড়া এলাকার রাজিবুল ইসলামের স্ত্রী। তার প্রতিষ্ঠানের নাম আরএম ফুড কর্নার। মাংসের আচারের পাশাপাশি ঘিসহ বিভিন্ন ধরনের আচার, লাচ্ছা সেমাইয়ের মতো পণ্যও রয়েছে আরএম ফুড কর্নারের ব্যানারে।
তিনি বলেন, আমার স্বামী বগুড়ার একটি চার তারকা হোটেলে হিসাব বিভাগে চাকরি করতেন। করোনার প্রভাবে আমার স্বামীর চাকরি চলে যাওয়ার পর আমরা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ি। পরিবার নিয়ে আর্থিক অভাবের মধ্যে ডুবে যাব এমন অবস্থা হয়েছিল। সে সময় আমার শিশুকন্যার মাটির ব্যাংকে জমানো ৩০০ টাকা দিয়ে আলুর চিপস বানিয়ে অনলাইনে বিক্রি শুরু করি। কিছু টাকা হলে কাপড়ের ব্যবসার মাধ্যমে টাকা উপার্জনের চেষ্টা করি। কিন্তু এই ব্যবসায় ভালো কিছু হচ্ছিল না। পরে মাংসের আচার করে অনলাইনে বিক্রির পরিকল্পনা করি। আচার বানিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার চালানোর পর ভালো সাড়া পাই। এরপর থেকে আমাদের দুশ্চিন্তা মিলিয়ে যায়। এখন প্রতি মাসে ২০০ থেকে ৩০০ কেজি গরুর আচার বিক্রি হচ্ছে। এখন ৬৪ জেলার পাশাপাশি দেশের বাইরে ১৭টি দেশে আমার আচার পাঠানো হচ্ছে।
তবে একটি বড় চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেছেন মাসুমা। সরাসরি বিদেশে আচার রপ্তানির অনুমোদন না থাকায় অনেক দেশে পাঠাতে পারছেন না। তিনি সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করেছেন, যেন নিজস্ব লাইসেন্সে বৈধভাবে পণ্য রপ্তানি করতে পারেন।
স্বামীর চাকরি চলে যাওয়ার পর আর চাকরির পেছনে না ছুটে, উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্তই তাদের জীবন বদলে দিয়েছে বলে জানান মাসুমার স্বামী রাজিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাংসের আচারে সফলতা পাওয়ার পর নতুন করে আর কোথাও চাকরিতে জয়েন করিনি। আরএম ফুড কর্নারের যাবতীয় দেখাশোনা করছি।
তিনি আরও বলেন, ‘একসময় মায়ের হাতে রান্না করা মাংসের আচার খেয়েছি। এখন ব্যবসার পাশাপাশি মাংসের আচার খেতে পারছি। আচার খেতে গিয়ে মায়ের হাতে রান্না করা মাংসের আচারের কথা মনে পড়ে যায়। সেই স্বাদের কথা মনে পড়ে যায়। এখন আমাদের সঙ্গে সাতজন কর্মচারী কাজ করেন। আমরা ব্যবসার পরিধিটা বাড়াতে চাই।’
বিসিক থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আরও সুসংগঠিত হচ্ছেন মাসুমা। এ ব্যাপারে বিসিক বগুড়ার উপ-মহাব্যবস্থাপক একেএম মাহফুজুর রহমান বলেন, মাসুমা আমাদের এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ সফল উদ্যোক্তা। তার এই সফলতা দেখে অনেক নারী উদ্যোক্তা বাসায় থেকে কাজ শুরু করেছেন।
মাসুমার মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বগুড়া চেম্বার অব কমার্স। চেম্বারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, ‘মাসুমার তৈরি মাংসের আচার সারা দেশে সুনাম কুড়িয়েছে। এই আচার বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে চেম্বার সব ধরনের সহযোগিতা করবে।’