প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৫ ১১:৫৮ এএম
ছবি- মেহরুজ মুনীর
সোলারিস অর্থাৎ সূর্যের মতো। ভোরবেলা আকাশের রঙ বদল থেকে শুরু করে সারা দিন ব্যাপী নানাভাবে বদলায় সূর্যের রঙ। সূর্যের শক্তি কতটুকু তা বোধহয় অনুধাবন করতে পারেন শুধু তারাই যারা এর বদলে যাওয়া রঙগুলোকে বেশ লম্বা সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। সূর্যের কিরণ কীভাবে দীপ্তি ছড়ায়, কীভাবে সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় এর সবই কিন্তু গভীর পর্যালোচনার বিষয়। আর এই নিরীক্ষাধর্মী কাজটি সুনিপুণ হাতে পোশাকের গায়ে ফুটিয়ে তুলেছেন ফ্যাশন ডিজাইনার ও জুরহেমের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর মেহরুজ মুনীর। তার এই অসাধারণ সংগ্রহটি উপস্থাপিত হবে হাউস অব ভেনডমে।

প্রথমবারের মতো ফ্রান্সের প্যারিসে বাংলাদেশি লাক্সারী ফ্যাশন ব্র্যান্ড জুরহেম তাদের ফল/উইন্টার ২০২৫ সংগ্রহ উন্মোচন করতে যাচ্ছে। হাউজ অব ভেন্ডোমে এই আয়োজনটি যদিও সরাসরি প্যারিস ফ্যাশন উইকের অংশ নয়, তবে এই ফ্যাশন উইকের মধ্যেই ৮ মার্চ ‘জুরহেম’ তাদের এই সংগ্রহ উপস্থাপন করবে চ্যাপেল সেন্ট জন দ্য’আর্ক–এ।
সোলারিস - সূর্যের এক মহাজাগতিক ভ্রমণ
জুরহেমের নতুন সংগ্রহ ‘সোলারিস’ সূর্যের মহাজাগতিক যাত্রা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে। ১৫টি পুরুষদের পোশাক এবং ৫টি নারীদের পোশাক নিয়ে সাজানো এই সংগ্রহে সূর্যের গতিপথের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সূক্ষ্ম অলঙ্করণ ও নান্দনিক সিলুয়েটের মাধ্যমে।
রঙের ব্যবহারে দিনের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরা হয়েছে। সাদা থেকে সোনালী, সোনালী থেকে সবুজ। রঙের বদলে ধরা পড়েছে সূর্যের আলাদা আলাদা মুহূর্তের সৌন্দর্য। ভোরের আলো ও সূর্যোদয় বোঝানোর জন্য বেছে নেয়া হয়েছে সাদা রঙ, যা ধবধবে সাদা মুক্তার নকশায় সজ্জিত। এরপর সোনালি রঙ সংযোজিত হয়েছে ঝলমলে বিডওয়ার্ক ও চকচকে স্টোন এমবেলিশমেন্টের মাধ্যমে, যা সূর্যের "গোল্ডেন আওয়ার"-এর উজ্জ্বলতা প্রতিফলিত করে। আরও খানিকটা অগ্রগতির সাথে সাথে সবুজ রঙ সোনালির সঙ্গে মিশে গেছে, যা মহাকাশ থেকে পৃথিবীর সবুজ ভূদৃশ্যের অনুরূপ। অবশেষে, গভীর কালো রঙ সূক্ষ্ম অলঙ্করণ ও বিডওয়ার্কের মাধ্যমে রাতের আকাশের বিশালতাকে প্রতিফলিত করেছে। এই কাজগুলো করা হয়েছে দেশীয় সিল্ক ও বিদেশি কাপড়ে। বিড ও সূচিকর্মের অলংকরণে প্রতিটি পোশাক হয়ে উঠেছে নজরকাড়া। প্রতিটি কাজ দেখলেই দক্ষতার ছাপ স্পষ্ট বোঝা যায়।
জুরহেমের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেত্র পুরুষদের পোশাক, যেখানে কাঠামোগত টেইলরিং এবং উদ্ভাবনী লেয়ারিং ব্যবহৃত হয়েছে। এতে সূক্ষ্মভাবে তৈরি সুট জ্যাকেট, টাক্সেডো, ওভারকোট এবং পার্কা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ক্লাসিক সিলুয়েটকে আধুনিকভাবে পুনর্গঠিত করা হয়েছে—ক্রপড জ্যাকেট ও বন্দগালা ইউরোপীয় বাজারের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, অন্যদিকে কর্সেটেড এনসেম্বল ও ফ্লোর-লেন্থ ট্রেনের মতো সাহসী ডিজাইন পুরুষদের ফ্যাশনের সীমানাকে প্রসারিত করেছে।
নারীদের জন্য, মেহরুজ মুনীর পাঁচটি চমকপ্রদ কুতুর গাউন উপস্থাপন করেছেন, যা হাই-এন্ড ফ্যাশনের নিখুঁত উদাহরণ। ড্রামাটিক ট্রেন, ভাস্কর্যতুল্য আকৃতি এবং কৌশলগত কাটআউটের মাধ্যমে প্রতিটি গাউনে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী কুতুর ফ্যাশনের প্রতি সম্মান জানিয়ে, এই সংগ্রহটি সূক্ষ্ম কারিগরি ও রাজকীয় সৌন্দর্যের প্রতিচিত্র তুলে ধরেছে। আমাদের দেশীয় ক্রাফটসম্যানশীপ যে কতটা উন্নত, সেটা যেন আরও সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে এই কাজগুলোতে।
ঐতিহাসিক ভেন্যুতে মহাজাগতিক অলঙ্করণ
‘সোলারিস’ সংগ্রহের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য বৃত্তাকার অলঙ্করণ, যা সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের প্রতীকী রূপ বোঝায়। কিছু ডিজাইনে এটি উজ্জ্বল সূর্যকিরণ হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে, আবার কিছু ডিজাইনে নক্ষত্রমণ্ডলের জটিল বিন্যাসের মতো সাজানো হয়েছে, যা মহাজাগতিক সৌন্দর্যের প্রতিফলন ঘটায়।
প্যারিসের হাউজ অব ভেন্ডম এমন একটি ফ্যাশন হাউস, যা উদীয়মান ডিজাইনারদের জন্য এক্সক্লুসিভ রানওয়ে শো এবং কিউরেটেড ইভেন্টের মাধ্যমে একটি প্ল্যাটফর্ম দেয়। ঔজ্জ্বল্য, গুণমান ও পরিশীলিত নকশার উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে। এই হাউজটি উদ্ভাবনী ডিজাইনারদের ইউরোপীয় বাজারে নিজেদের কাজগুলো তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। হাউজ অব ভেন্ডমের বেশ কয়েকটি শো অন্য ভেন্যুতে হলেও জুরহেমের শো হচ্ছে এই ঐতিহাসিক ভেন্যু ঐতিহাসিক চ্যাপেল সেন্ট জন দ্য’আর্ক এ। ১৯১৪ সালে নির্মিত এই চ্যাপেলটি জোয়ান অব আর্কের সম্মানে উৎসর্গ করা। ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন এই স্থানেই হতে যাচ্ছে জুরহেমের প্যারিসিয়ান অভিষেক। এটি যে জুরহেমের যাত্রাতে বিশেষ এক মাত্রা যোগ করবে সেটা নিশ্চিত করে বলাই যায়। 
২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জুরহেম দ্রুতই বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় লাক্সারী ফ্যাশন ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, যা Prêt-à-porter এবং Bespoke ডিজাইনের নিখুঁত মিশ্রণ উপস্থাপন করে। ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ও স্বনামধন্য ফ্যাশন ডিজাইনার মেহরুজ মুনীরের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বে, ব্র্যান্ডটি বাংলাদেশে হাই-এন্ড ফ্যাশনের সংজ্ঞা নতুনভাবে গড়ে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। জুরহেমের এই প্যারিস অভিষেক শুধু ব্র্যান্ডটির জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশি ফ্যাশনকে বৈশ্বিক ফ্যাশন অঙ্গনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
প্যারিসের শো নিয়ে বিস্তারিত জানাতে জুরহেম হেডকোয়ার্টারে ২ মার্চ আয়োজন করা হয় একটি সংবাদ সম্মেলনের। এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মেহরুজ মুনীর, দেশের শীর্ষস্থানীয় কোরিওগ্রাফার ও মেন্টর আজরা মাহমুদ এবং সিনিয়র ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল সাংবাদিক শেখ সাইফুর রহমান।
ছবি - জুরহেম ও প্রতিদিনের বাংলাদেশ