হিরা তালুকদার
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৩ ১৪:৩৯ পিএম
ফাইল ফটো
‘মামলার বিচার করতে দেরি হলে ন্যায়বিচার কথাটি আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে। তাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়াতে হবে। এর জন্য দরকার বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি।’ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।
দারিদ্র্য, সংখ্যালঘু বিচার, বেকারত্ব ও মানবাধিকারের সমস্যা মোকাবিলার জন্য আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে আইনজ্ঞরা বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। আর সবার আগে প্রয়োজন দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করা। বিচারে বিলম্ব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশের বিচারালয়ে প্রায় ৪০ লাখ মামলা পেনডিং (বিচারাধীন) আছে। মামলা নিষ্পত্তির গতিও সন্তোষজনক নয়।’
বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে জনগণ আদালতমুখী হতে চান না উল্লেখ করে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘জনগণের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে মামলা নিষ্পত্তির হার অবশ্যই বাড়াতে হবে বিচার বিভাগকে। নইলে ন্যায়বিচার মুখ থুবড়ে পড়বে।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের কারণে বাঙালি জাতির হাজার বছরের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থা ধ্বংসের পথে। একের পর এক ভয়ংকর নারী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় দেশের মানুষ ভীত, সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরা পড়ছে, অপরাধ স্বীকারও করছে, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার কার্যক্রম সমাজে তেমন কোনো প্রভাব ফেলছে না; যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে জটিল করে তুলছে।’
তিনি বলেন, ‘দেশে যতদিন না আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে পারব, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা থেকে বের হয়ে আসতে পারব, মানুষ ততদিন পর্যন্ত নিরাপদ হবে না।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘মামলায় বিলম্ব মানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বাধা। বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি আমাদের দেশের একটা বড় সমস্যা। এর জন্যই আজ বিচারিক ও সুপ্রিম কোর্টে প্রায় ৪০ লাখ মামলার জট লেগে আছে।’ আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম চাওয়া ছিল জনগণকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়া। কারণ তিনি কখনও ন্যায়বিচার পাননি। এমনকি মৃত্যুর পরও ন্যায়বিচার পাননি। সেক্ষেত্রে আজকে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে, বিচার বিভাগকে এমনভাবে সাজানো, যাতে বাংলাদেশের জনগণের দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার পূরণ হয়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
অপরাধ যে সময়ই হোক, যে স্থানেই হোক, মানুষ যেন দ্রুত বিচার পেতে পারে, সেই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে প্রতিবছরের মতো আজ ১৭ জুলাই পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস। ১৯৯৮ সালের আজকের এই দিনে বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিশেষ আদালতটির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে। তবে যেকোনো দেশেই এই আদালতের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের জেনোসাইড কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে নুরেমবার্গ ও টোকিওতে সংঘটিত হওয়া অপরাধের বিচারকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এসব ঐতিহাসিক ঘটনা ন্যায়বিচার পাওয়ার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। এসব ঘটনা ও সাফল্য ‘রোম সংবিধি’র মতো চুক্তি প্রতিষ্ঠার পটভূমি তৈরি করতে সাহায্য করে। বেশ কয়েকটি দেশ এই চুক্তির সঙ্গে একাত্ম হয়েছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।