ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৩ ১০:৩৬ এএম
আপডেট : ২৪ মে ২০২৩ ১১:২১ এএম
ফাইল ফটো
২০১৫ সাল। বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি ঘিরে দেশব্যাপী চলছিল আগুনসন্ত্রাস। ওই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকাগামী আইকন পরিবহনের একটি বাসে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে কক্সবাজার থেকে ফিরছিলেন যশোরের জাসদ নেতা নুরুজ্জামান পপলু। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে পৌঁছানোর পর তাদের বহনকারী বাসটি লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছোড়ে নাশকতাকারীরা। বাসের বেশিরভাগ যাত্রী তখন গভীর ঘুমে। হঠাৎ জ্বলে ওঠা দাউ দাউ আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা করার সুযোগ হয়নি কারও। আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন সাতজন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও একজন। আহত হন অন্তত ২৭ জন।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন পপলু ও তার দশম শ্রেণিপড়ুয়া কন্যা মাইশা তাসনিম নাহিয়ান। দগ্ধ হয়েও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান পপলুর স্ত্রী মাফরুহা বেগম ও ছেলে আসিফ ইমতিয়াজ জামান। প্রাণ বাঁচলেও দুঃসহ সেই ঘটনার কথা আজও ভুলতে পারেন না মাফরুহা। স্বামী ও সন্তানকে চোখের সামনে আগুনে পুড়তে দেখার সেই ভয়াবহ স্মৃতি কী করে ভুলবেন তিনি! সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী স্বামীকে হারিয়ে ছেলেকে নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করেছেন স্বামী ও মেয়ে হত্যার বিচার পাওয়ার আশায়। কিন্তু ওই ঘটনার পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও মাফরুহার আশা পূরণ হয়নি। চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রলবোমা হামলার ওই ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের হলেও বিচারকাজ শেষ হয়নি এখনও।
২০১৩-১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন কর্মসূচি চলাকালে পেট্রলবোমা হামলার এমন একাধিক ঘটনায় দেশজুড়ে প্রাণহানি ঘটেছে শতাধিক মানুষের। এর মধ্যে আগুনে পুড়েই মারা গেছেন অর্ধশতাধিক। কুমিল্লা ছাড়াও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ, মগবাজার ও গাবতলীতে একই কায়দায় যানবাহনে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও আছেন নিহত ব্যক্তির তালিকায়। এ সময় আন্দোলনের নামে রেললাইন উপড়ে ফেলাসহ সরকারি সম্পদ ধ্বংস করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
আওয়ামী লীগ বরাবরই নাশকতামূলক এসব কর্মকাণ্ডের জন্য বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটকে দোষারোপ করে আসছে। অগ্নিসন্ত্রাসের এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় এজাহার ও চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে বড় অংশই বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের তরফ থেকে ওই সময় নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিতের কথা বলা হলেও এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার একটিও আজ অবধি নিষ্পত্তি হয়নি। এ নিয়ে আক্ষেপের শেষ নেই স্বজনহারা পরিবারের সদস্যদের। বিচার অনিশ্চয়তায় হতাশা বাড়ছে তাদের। অনেকে ব্চিার পাওয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছেন।
কিন্তু ৮-১০ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও এসব মামলা কেন নিষ্পত্তি হচ্ছে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, সাক্ষীর অভাব, সরকারি কৌঁসুলিদের তৎপরতা না থাকাসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতায় আটকে আছে অগ্নিসন্ত্রাস ও নাশকতার মামলাগুলো। এ নিয়ে সরকারের শীর্ষ মহলেও আলোচনা চলছে। রাজধানীতেই চাঞ্চল্যকর নাশকতা মামলার বিচার হচ্ছে না। কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই পরবর্তী শুনানির সময় নিয়ে যাচ্ছেন আসামিরা। দীর্ঘ সময় মামলা কেন নিষ্পত্তি হচ্ছে না, তা নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং কর্মকর্তা পর্যায়ে বৈঠক ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, ২০১৩-১৫ সালে নাশকতার মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। মামলাগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের জন্য প্রস্তুত করতে আইন মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ কাজ এগিয়ে নিতে সরকারের একটি কমিটিরও কাজ করার কথা রয়েছে। সেই সূত্রে মামলার অগ্রগতিসহ আসামি ও তাদের পিতার নাম, মামলার নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত চাওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অগ্নিসন্ত্রাস ও নাশকতা করে যারা দেশকে অস্থিতিশীল করার অপপ্রয়াস চালিয়েছিল, তাদের বিচার করা হবে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমি ও আমার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সচেষ্ট রয়েছি। ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
শিগগিরই সমাধান হয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, এরই মধ্যে তৎকালীন নাশকতার মামলাগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এখন কীভাবে নিষ্পত্তি করা যাবে, তা নিয়ে সব পর্যায়ে কথা বলা হচ্ছে। সহসা নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।
সূত্র বলছে, রাজধানীতেই বহুল আলোচিত সাড়ে পাঁচশ নাশকতার মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে আছে। মামলার দিন এলেই প্রতিপক্ষ লোকজন পরবর্তী দিনের জন্য সময় নিচ্ছেন। সরকারি কৌঁসুলিদের বিরোধিতার মুখোমুখি না পড়ায় পরবর্তী তারিখ পেয়ে যাচ্ছেন তারা। দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে পড়ে বিচারও দেরি হচ্ছে। আর এর সুযোগও নিচ্ছেন এজাহারভুক্ত আসামিদের অনুসারীরা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পুনরায় নাশকতা ঘটানো হতে পারে- এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যায়ে একাধিক সভাও হয়েছে। সভায় ঝুলে থাকা মামলা নিয়ে আলোচনা হয়। কী কারণে এসব মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণও হয়।
ওই সভায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, আইনি প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে মামলাগুলোর চার্জশিট দিতে ব্যাপক সময় নিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এ ছাড়া প্রতিটি মামলায় আসামির সংখ্যা বেশি হওয়ার পাশাপাশি তাদের অবস্থানের কারণে তদন্তে ধীরগতি ছিল। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর আগে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী পর্যায়েও আলোচনাও হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাশকতা মামলার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বেশিরভাগ মামলার আসামি এলাকায় থাকেন না। তাদের নাম-ঠিকানা খুঁজে বের করে চার্জশিট দেওয়া তদন্তকারী কর্মকর্তার পক্ষে খুব কঠিন হয়ে যায়। আর যেসব মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়ার কারণে সেগুলোরও বিচার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে না। তা ছাড়া পলাতক আসামিদের বিষয়ে কিছু আইনি জটিলতার কারণেই বিচারের দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট গাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, অগ্নিসন্ত্রাসের মামলায় সাক্ষী না আসায় বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকছে। এতে নিহতের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধনী আনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সাক্ষী হাজির করার জন্য আলাদা সংস্থা গঠন করা যেতে পারে। তখন এ ধরনের সমস্যা আর থাকবে না। কারণ তখন যারা তদন্ত করেন, তারাই সাক্ষী হাজিরের দায়িত্বে থাকবেন।