প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৩ ১৫:২৭ পিএম
আপডেট : ১১ মে ২০২৩ ১৫:৫২ পিএম
গ্রেপ্তার সাইদুল ইসলাম। প্রবা ফটো
গাজীপুরের দক্ষিণ সালনা এলাকায় বাসায় ঢুকে কলেজছাত্রী রাবেয়া আক্তারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গৃহশিক্ষক সাইদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। জানা গেছে, ছাত্রীকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন সাইদুল। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৬৫০ টাকা দিয়ে ছুরি কিনে ঘরে ঢুকে ছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১১ মে) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি জানান, গত ৮ মে রাতে গাজীপুরের সালনা এলাকায় গৃহশিক্ষক সাইদুল কলেজছাত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা এবং নিহতের মা ও দুই বোনকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে।
এ ঘটনায় ভিকটিমের বাবা গাজীপুর সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। হত্যাকাণ্ডটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। র্যাব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত গৃহশিক্ষককে গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে।
বুধবার রাতে র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১ এর একটি দল টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর এলাকা থেকে আসামি সাইদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নানা তথ্য দেন।
কমান্ডার আল মঈন আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার সাইদুল জানিয়েছেন, ২০২০ সালে করোনাকালে পরিবারের সবাইকে আরবি পড়ানোর জন্য গৃহশিক্ষক হিসেবে ভিকটিমের বাবা তাকে নিয়োগ দেন। আরবি পড়ানোর সুবাদে তিনি প্রতিনিয়ত ভিকটিমের বাসায় যাওয়া-আসা করতেন। একপর্যায়ে পরিবারটির সদস্যদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক তৈরি হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ভিকটিমকে মৌখিকভাবে বিয়ে করেন সাইদুল। বিয়ের বিষয়টিকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভিকটিম ও তার পরিবারকে চাপ দিতে থাকেন তিনি। মেয়েটির পরিবার বিষয়টি জানতে পেরে সাইদুলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
২০২২ সালের অক্টোবরে রাবেয়া আক্তারকে উত্ত্যক্ত করার বিষয়ে ওই ছাত্রীর বাবা থানায় একটি অভিযোগ দাখিল করেন। এরপর সাইদুল কিছুদিন উক্ত্যক্ত করা থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু গত দুই মাস ধরে ভিকটিমের কলেজে এবং বাসার বাইরে যাওয়া-আসার পথে পুনরায় তাকে উত্ত্যক্ত করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। এর মধ্যেই সাইদুল জানতে পারেন যে, উচ্চ শিক্ষার জন্য রাবেয়া আক্তারের পরিবার তাকে দেশের বাইরে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে না পেরে হত্যার পরিকল্পনা করেন সাইদুল।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গত ৭ মে বিকালে স্থানীয় বাজারে কামারের দোকান থেকে ৬৫০ টাকা দিয়ে গরু জবাইয়ের একটি ছুরি তৈরি করতে দেন। পরদিন সন্ধ্যায় ছুরি সংগ্রহ করে ভিকটিমের বাসায় ঢুকে তার মাথা, গলা, হাত ও পায়ে উপর্যুপরি আঘাত করেন। মেয়েটির চিৎকারে তার মা ও দুই বোন তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে তাদেরও কুপিয়ে জখম করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান সাইদুল। চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন গিয়ে তাদের উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাবেয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া তার মা ও ছোট দুই বোনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
হাসপাতালে নেওয়ার পথে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাদের উত্তরার একটি হাপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে ভিকটিমের মা আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন।
গ্রেপ্তার সাইদুল চট্টগ্রামের একটি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন। তিনি গাজীপুরের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করতেন এবং এলাকার বিভিন্ন বাসায় প্রাইভেট পড়াতেন। দুই মাস আগে দুটি চাকরিই ছেড়ে দেন। ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য টাঙ্গাইলের ভূঞাঁপুরে এক বন্ধুর বাসায় আত্মগোপনে যান। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় গতরাতে র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে।
২০২০ সালে জয়দেবপুরের একটি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করেন রাবেয়া আক্তার। পরে গাজীপুর চৌরাস্তার একটি কলেজে স্মাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। পড়ালেখার পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক স্থানীয় একটি বিউটি প্রোডাক্ট শপে চাকরি করতেন। এর পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।