প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৩ ১৬:৩৬ পিএম
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৩ ১৭:২১ পিএম
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানিকগঞ্জ সদর থানার এসআই মাসুদ রানা। ছবি : সংগৃহীত
মানিকগঞ্জে রুবেল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাসুদ রানাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে জেলা পুলিশ সুপারকে (এসপি) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বরখাস্ত থাকবেন বলেও আদেশে বলা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানার ৪২ ঘণ্টার মধ্যে রুবেল হত্যার ঘটনা তদন্ত শেষ করার বিষয়ে করা রিটের শুনানি করে বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি এসএম মাসুদ হোসেন দোলনের হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার (৩ এপ্রিল) এ আদেশ দেন।
আদেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তা দিয়ে মামলাটির তদন্ত করার এবং পুলিশ সুপারের নিচে নন এমন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করতে বলেছেন হাইকোর্ট।
এ ছাড়া বাদী নিজে মামলা করেননি, এটা সঠিক কি না, সুপারসনিক গতিতে মামলার তদন্ত শেষ করা হয়েছে, এ ঘটনায় আসামি ছাড়া অন্য কোনো থার্ডপার্টি জড়িত কি না, এসব বিষয় ধরে তদন্ত করার জন্য বলেছেন হাইকোর্ট।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এ দিন রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
শুনানির শুরুতে হত্যা মামলা ৪২ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্ত প্রসঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তার উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেন, 'আপনার মতো পুলিশ অফিসার দরকার। আপনি মাত্র ৪২ ঘণ্টায় হত্যা মামলা তদন্ত শেষ করলেন? এ সময়ের মধ্যে কখন সাক্ষী নিলেন, কখন ঘুমালেন, কখন খাওয়া-দাওয়া করলেন, তা আমাদের দেখান। আর কতটি মামলা আপনি তদন্ত করেছেন, সেগুলো কত সময়ে শেষ করেছেন, তার তালিকা দিন।'
এ সময় পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, 'এটা আমার প্রথম তদন্ত।'
এরপর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী বলেন, 'চার্জশিট দ্রুত দিলেও সমস্যা। আবার দেরি করে দিলেও সমস্যা।'
আদালত বলেন, 'তাহলে আমরা একটা মক ট্রায়াল করি। কত দ্রুত চার্জশিট দিতে পারেন, সেটা আমরা দেখতে চাই।'
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, 'সেটা দেখার এখতিয়ার আপনাদের আছে।'
একপর্যায়ে আদালত দাখিল করা নথিতে দেখতে পান, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানার মামলার একটি তদন্ত প্রতিবেদন রেফারেন্স হিসেবে নথিতে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এ সময় আদালত পুলিশ কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানাকে ভর্ৎসনা করে বলেন, 'কেন আপনি এটা দিলেন। আপনার কাছে তো রেফারেন্স চাওয়া হয়নি। বেশি স্মার্টনেস দেখাচ্ছেন। নিজেকে বেশি স্মার্ট মনে করেন? কোর্টের সঙ্গে বেশি স্মার্টনেস দেখাবেন না। একেবারে কারাগারে পাঠিয়ে দেব।'
পরে আদালত এই মামলার শুনানি মুলতবি করেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
১৪ মার্চ মানিকগঞ্জ সদরের কৈতরা গ্রামের মো. রুবেল নামের ২২ বছরের এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করার পর শুরু করে ৪২ ঘণ্টার মধ্যে তার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেন পুলিশের ওই এসআই মাসুদ।
৪২ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্ত কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রুবেল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানিকগঞ্জ সদর থানার পুলিশের উপপরিদর্শক মো. মাসুদ রানাকে কেস ডকেটসহ ৩ এপ্রিল আদালতে হাজির হতে বলা হয়।
এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি এসএম মাসুদ হোসেন দোলনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
১ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে ‘লাশ উদ্ধার থেকে অভিযোগপত্র, ৪২ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্ত’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদন সংযুক্ত করে হাইকোর্টে রিট করা হয়।
ওই প্রতিবেদনের একাংশে বলা হয়, মরদেহ রাত দেড়টায় উদ্ধারের পর সুরতহাল করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়েছে হাসপাতালে। এরপর মামলা, আসামি গ্রেপ্তার, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, মানচিত্র তৈরি, সাক্ষ্যগ্রহণসহ একে একে অন্তত ৯টি ধাপ পেরিয়ে হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয় ২২ ঘণ্টায়। পরবর্তী ২০ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়সহ তদন্তের সব প্রক্রিয়া শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অর্থাৎ মরদেহ উদ্ধার থেকে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে পুলিশের সময় লেগেছে ৪২ ঘণ্টা।
দুই দিনের কম সময়ে খুনের মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়ার ঘটনায় অনেকে প্রশংসা করলেও প্রশ্ন তুলেছেন আইন ও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, মামলাটির তদন্ত শেষ হয়েছে রকেটের চেয়েও দ্রুতগতিতে। এটি ব্যতিক্রমী ও আশ্চর্যজনক ঘটনা। পুলিশের এমন তদন্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাও।
শুনানি শেষে রিটকারী আইনজীবী সাংবাদিকদের বলেন, 'ঘটনার আগেই সাধারণ ডায়েরি করা হয় কীভাবে? আর ২ ঘণ্টা ১০ মিনিটে ১৩ সাক্ষীর জবানবন্দি টাইপ করে রেকর্ড করা হয় দুটি ভিন্ন জায়গায়। প্রতি ৯.৫ মিনিটে একজনের জবানবন্দি টাইপ করে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, কাগজে লিপিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু জবানবন্দিগুলো টাইপ করা।'
জিডিতে উল্লেখ করা হয়, তিনি ১০টা ৩৫ মিনিটে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হন এবং ১০টা ৪৫ মিনিটে থানার উদ্দেশে রওনা করেন। অপরপক্ষে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে উল্লেখ আছে যে, তিনি ১১টার সময় কোর্টে আসামিকে নিয়ে যান এবং ৩টায় মানিকগঞ্জ কারাগারে আসামিকে প্রেরণ করা হয়।