প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২০:১৭ পিএম
আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২০:৩২ পিএম
সংগৃহীত ফটো
উচ্চ আদালতের ব্যবহারিক ভাষা এখনও ইংরেজি। সেখানে ইংরেজিতে রায় লেখার কারণে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয় বিচারপ্রার্থীদের। ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পরও বাংলা এখনও আইনের ভাষা হয়নি। এটা লজ্জাজনক। শনিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘আদালতের সর্বস্তরে বাংলাভাষার প্রচলন’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. আবদুল মতিন বলেন, ’চাইলে রাতারাতি আদালতের সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন সম্ভব। এটা জনগণকে জোরালোভাবে চাইতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ’ইংরেজির বাস্তবতাকেও মাথায় রাখতে হবে। আর আদালতের ভাষা কতটুকু সহজবোধ্য করা যায়, সেটাও ভেবে দেখতে হবে।’
সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন বলেন, ’সুপ্রিম কোর্ট একটা রুল দিলেই সব আদালত সেটি মানতে বাধ্য। এক্ষেত্রে সরকার অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে স্বাধীনতার ৫১ বছর পর আমরা বলছি আমাদের আইন বাংলায় হতে হবে। বাংলাভাষা বিশ্বের ভাষা হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও রাষ্ট্রের ভাষা হয়ে ওঠেনি।’
সভাপতির বক্তব্যে হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পর আজকে আমরা এ দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছি। এ দায় আমাদের পূর্বপুরুষদের এবং সমকালীনদের। অথচ স্বাধীনতাযুদ্ধের সূতিকাগারই ছিল এই ভাষা আন্দোলন। আমরা দাঁড়িয়েছি, কতটা পারব তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ড. মো. শাহজাহান, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্ল্যানিং এডিটর আসজাদুল কিবরিয়া, কলামিস্ট ও লেখক ফারুক ওয়াসিফ, লেখক ও প্রাবন্ধিক ফিরোজ আহমেদ এবং বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক রাখাল রাহা প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, ‘আমাদের মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষা উভয়ই বাংলা। ফলে এটি নাগরিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে সার্থকভাবে প্রয়োগের একটি ভাষা। কিন্তু রাষ্ট্রের আইন ও শাসন বিভাগের মতো বিচার বিভাগের সর্বস্তরে এখনও যথাযথভাবে বাংলার প্রচলন হয়নি। ফলে নিজ ভাষায় আইনি প্রতিকার, রায় বা আদেশ অনুধাবনের জন্য মানুষকে অর্থ ব্যয় করতে হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।’
তারা বলেন, ‘বাংলায় বিচারকাজ না হওয়ায় সাধারণ জনগণ মাতৃভাষায় বিচারপ্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে একদিকে ভাষার জন্য আমাদের অর্জন লুণ্ঠিত হচ্ছে, অপরদিকে বিচারিক ফলাফল বিচারপ্রার্থীদের মনে দুর্বোধ্যতার জাল ছড়িয়ে দিচ্ছে।’
বক্তারা বলেন, ‘আইনের ভাষা কঠিন করা হয় সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করার জন্য। আমাদের মাঝে এখনও ঔপনিবেশিক মানসিকতা রয়েছে। সর্বস্তরে বাংলার বিষয়ে প্রতিকূল পরিবেশ রয়েছে। আদালতের ভাষা বাংলা করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। খেয়াল রাখতে হবে, সরকারি নির্দেশনাগুলো যেন দুর্বোধ্য করা না হয়। আমাদের দেশে যারা কুলীনতা বজায় রাখতে চান, তারা আদালতের সর্বস্তরে বাংলাভাষার প্রচলন চান না।’
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাহিদ ফেরদৌসী।