প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:০৯ পিএম
ফাইল ছবি
জনস্বার্থে করা রিট মামলাগুলোয় আদালতের দেওয়া আদেশ-নির্দেশ না মেনে আমলারা একের পর এক অপরাধ করে চলেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা আদালত অবমাননার তোপে পড়েন। কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই আমলারা আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা’ করেন এবং ‘এখন থেকে আদালতের আদেশ-নির্দেশ মেনে চলা’র প্রতিশ্রুতি দিয়ে পার পেয়ে যান। এতে একদিকে সমস্যাগুলোর সমাধান হয় না; অন্যদিকে জনগণের ভোগান্তিও যায় না। এভাবেই চলতে থাকে বছরের পর বছর।
বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা বলছেন, আমলারা আদালতের নির্দেশ অমান্য করলে নিঃশর্ত ক্ষমা নয়, তাদের কঠোর সাজার মুখোমুখি করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রায় সব আদালত অবমাননার মামলার বিবাদীরা হচ্ছেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা কিংবা প্রধান নির্বাহী। আদালত অবমাননার মামলা দায়েরের আগে সতর্ক করে প্রথমে আইনজীবীরা লিগ্যাল নোটিস পাঠান। নোটিস অনুযায়ী প্রতিকার না পেলে মামলা করেন। হাইকোর্ট মামলার শুনানি গ্রহণ করে বিবাদীদের প্রতি রুল জারি করেন। রুলের বিষয়ে বিবাদীদের কাছে নোটিস যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, নোটিস পেয়েও বিবাদীরা নির্বিকার থাকছেন। উচ্চ আদালতের রুলের বিষয়ে থাকছেন ভ্রূক্ষেপহীন। বিবাদীরা আদালতে তাদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দাখিল করেন না। কালক্ষেপণের কূটকৌশল হিসেবে জবাব দেওয়ার জন্য বারবার আদালতের কাছে সময় নেন। এতে মামলাগুলো দীর্ঘসূত্রতায় পর্যবসিত হয়।
আদালত ৪ থেকে ৮ সপ্তাহ সময় বেঁধে দিলেও মাসের পর মাস রুলের জবাব আসে না। তাই আদালতের নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যে আইন আছে, সে আইনেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। নইলে এভাবে সুপ্রিম কোর্টকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়, বিশেষ করে জনস্বার্থে দেওয়া বিভিন্ন রায় ও আদেশ বাস্তবায়ন করতে নির্দেশ দেওয়া হয় সচিব, ডিসি, এসপিসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আমরা লক্ষ করছি আমলারা হাইকোর্টের আদেশকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে আদালতের আদেশকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেও শুনেছি। এটা হতেই পারে না। আদালত অবমাননার শাস্তি আরও বাড়াতে হবে। আর নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেই সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমা করে দেওয়া কমাতে হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘রুলের বিবাদীরা সরকারের প্রভাবশালী পদস্থ কর্মকর্তা। উচ্চ আদালতের রায়কে তাদের অনেকেই চরম অবজ্ঞা করছেন। যে কারণে অনেককেই হাইকোর্টের কাঠগড়ায় এসে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হয়েছে এবং হচ্ছে। এরপরও সব ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ থাকছে উপেক্ষিত। তাই ক্ষমা করে দেওয়া বাদ দিয়ে যেকোনো ধরনেরই হোক, একটা শাস্তি দিতে হবে আদালতের নির্দেশ অমান্যকারীকে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছিÑ হাইকোর্টের রায় সরকারি কর্মকর্তারা খুব একটা পাত্তা দেন বলে আমার মনে হয় না, যা একটা দেশকে পিছিয়ে নিতে ও আইনের শাসনকে বাধাগ্রস্ত করতে যথেষ্ট। সম্প্রতি যশোরের নোয়াপাড়ার একটি ট্যানারিকে ভৈরব নদে বর্জ্য ফেলার কারণে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। অথচ ছয় বছর আগেই যশোরের ডিসিকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্টের সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় হাইকোর্টকেই আবার নির্দেশ দিয়ে ট্যানারিটি বন্ধ ঘোষণা করতে হলো। তাই আমার মতে আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে আরও কঠোর হওয়া দরকার আদালতকেই। প্রয়োজনে বিদ্যমান আইন সংশোধন করে আরও কঠোরভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রক্ষকরাই তো এখন ভক্ষক। জনস্বার্থ মামলায় বিবাদী থাকেন সরকারি কর্মকর্তারা। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আদালতের নির্দেশ পালন করছেন না। এ কারণে রিটকারীদের আদালত অবমাননার মামলা করতে হচ্ছে আমলাদের বিরুদ্ধে। এরপর তারা হাইকোর্টের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ক্ষমাও চাইছেন। এরপর রায় বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিচ্ছেন। এর আগে নয়। আবার কেউ কেউ তো হাইকোর্ট থেকে নিজ কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে ভুলেই যাচ্ছেন কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর কথা।’
তিনি বলেন, গত ৭-৮ বছর ধরে সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা আদালত অবমাননা রায়ের কোনো আদেশ মানছেন না। শত শত মামলার রায় পড়ে রয়েছে। রায় হলেও বিবাদীদের শাস্তি হচ্ছে না।
করোনাকালীন স্বাস্থ্যসেবা খাত, পরিবেশদূষণ, বায়ু ও শব্দদূষণ, ওষুধের মূল্য, নিরাপদ সড়ক, সাগর-রুনি হত্যা মামলাসহ অন্তত ২০টি আদালত অবমাননা মামলার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে মনজিল মোরসেদ বলেন, বিচার বিভাগের দুর্বলতা এখানেই। আদালত অবমাননা মামলার রায়ে যদি কাজই না হয়, তাহলে এমন বিধান এবং আইন রেখে লাভ কী? রক্ষকই যদি ভক্ষক হন তাহলে দেশটা রক্ষা করবে কে?