বোরহানউদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
দেশের বিভিন্ন আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারি ও ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় হওয়া বহু মামলা এখনও বিচারাধীন। ঢাকার দেউলিয়া আদালতে বর্তমানে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, আর্থিক অক্ষমতা এবং ব্যবসায়িক বিরোধসংক্রান্ত মোট ১৭৮টি মামলা বিচারাধীন। আদালত সূত্র বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১২টি মামলার নিষ্পত্তি হলেও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এখনও উল্লেখযোগ্য।
একসময় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে দেউলিয়াত্ব, ঋণ খেলাপি, অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত মামলায় জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে বা সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচার এখনও চলমান।
দেশের আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলমার্ক গ্রুপ। সোনালী ব্যাংক থেকে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের অভিযোগে ২০১২ সালে একাধিক মামলা করা হয়। দীর্ঘ বিচার শেষে ২০২৪ সালে ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালত প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ, চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামসহ কয়েকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে এ-সংক্রান্ত আরও কয়েকটি মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে। ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও প্রতারণার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচারও দীর্ঘদিন ধরে চলছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছেন বহু বিনিয়োগকারী। বিসমিল্লাহ গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক মামলা করে। পরবর্তীতে অর্থপাচার মামলায় প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা দণ্ডিত হন। একইভাবে ক্রিসেন্ট গ্রুপের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে। অন্যদিকে, এস আলম গ্রুপকে ঘিরে ব্যাংকের মালিকানা, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত ও আইনি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকার দেউলিয়া আদালতের পেশকার মো. সাব্বির হোসেন জিসান জানান, বর্তমানে আদালতে ১৭৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার শুনানি ও বিচার কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১২টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আদালত নিয়মিত শুনানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেহেদী হাসান বলেন, আর্থিক খাতে অনিয়ম রোধে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তার মতে, মামলার তুলনায় আদালতের সংখ্যা কম হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঋণগ্রহীতাদের পাশাপাশি ঋণ অনুমোদনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। ঋণ প্রদানের আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও সম্পদের যথাযথ যাচাই নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ঢাকা জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মনির হোসেন ইমন বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অর্থঋণসংক্রান্ত মামলায় পরাজয়ের পর কিছু প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া ঘোষণার মাধ্যমে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। এতে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় এবং পাওনাদারদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
আইনজীবীদের মতে, বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলাগুলোতে বিপুল পরিমাণ নথি, অসংখ্য সাক্ষী, জটিল আর্থিক লেনদেন এবং আপিল প্রক্রিয়ার কারণে বিচার দীর্ঘায়িত হয়। ফলে অনেক মামলার নিষ্পত্তিতে এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যায়।
অর্থঋণ আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে রায় হলেও অর্থ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, সম্পদ বিক্রি হয়ে যাওয়া অথবা মালিকপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে পাওনাদাররা বাস্তবে ক্ষতির মুখে পড়েন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব ঘটনা দেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা, ঋণ বিতরণে অনিয়ম এবং করপোরেট সুশাসনের ঘাটতির প্রতিফলন। তারা মনে করেন, ব্যাংক ঋণ বিতরণে জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঝুঁকি থেকে যাবে।