মো. বোরহানউদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
জামিনের আদেশ মিলেছে, মুক্তির অপেক্ষাও বলতে গেলে শেষ। কিন্তু কারাগারের দরজা পেরোনোর আগেই নতুন আরেক মামলার নোটিস নিয়ে হাজির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী! এক মামলার শিকল খুলতে না খুলতেই বন্দিকে তখন জড়িয়ে পড়তে হয় আরেক মামলার বেড়াজালে।
একই সময়ের ঘটনা, প্রায় একই অভিযোগÑ শুধু বদলে যায় মামলার নম্বর আর থানার নাম। এ কারণে জামিন পেলেও মুক্ত পৃথিবীতে শ্বাস নেওয়া হচ্ছে না অনেকের। ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ নামে এই প্রক্রিয়া নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনা চলছে আদালতপাড়া থেকে শুরু করে আইন অঙ্গন ও মানবাধিকার মহলে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকার কেরানীগঞ্জের
মতিন খানকে। এরপর আদালতে তার জামিনের আবেদন করা হয়। কিন্তু মাত্র একটি মামলায় গ্রেপ্তার
হলেও এরপর তার নামে বিস্ফোরক দ্রব্য, নাশকতা, পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া ও রাষ্ট্রবিরোধী
কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মোট ছয়টি মামলা করা হয়েছে।
আরেক আসামি বাবুল মোল্লাকে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর
তাকেও শ্যোন অ্যারেস্টের মাধ্যমে আরও পাঁচটি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।
ঢাকা জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনির হোসেন ইমন প্রতিদিনের
বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর আরেকটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর
বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার। বিশেষত রাজনৈতিক মামলায় এই শ্যোন
অ্যারেস্ট নামক আইনের লুপহোলটি বিষফোড়ায় পরিণত হয়েছে। একজন সন্দিগ্ধ আসামি একটি মামলায়
জামিন পেলে তাকে অবৈধভাবে আটক রাখার উদ্দেশ্যে কারাগার থেকে গ্রেপ্তার দেখানো অবৈধ।
তবে যদি নতুন কোনো মামলায় ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় কারও দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কারও নামের সম্পৃক্ততা থেকে থাকে, তা হলে তাকে নতুন
মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো যায়।’
তিনি বলেন, ‘দমন পীড়নের লক্ষ্যে, জেলখানায় আটক রেখে স্বার্থসিদ্ধির
লক্ষ্যে পুলিশ এই শ্যোন অ্যারেস্ট বাণিজ্যে মেতে উঠেছে। একই সঙ্গে একজন লোক কত জায়গায়
ক্রাইম করতে পারে, সে বিষয়ে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো রাষ্ট্রপক্ষের
বিচারের নামে অবিচারই বটে।’
সাবেক বিচারক শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘একই সময়ের ঘটনার একাধিক মামলায়
শ্যোন অ্যারেস্টের আবেদন বিচারিকভাবে আরও সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আদালতের
সামনে প্রতিটি মামলার পৃথক ভিত্তি, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তদন্তের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে
উপস্থাপন করা উচিত। একই সঙ্গে বিচারকরা যাতে মামলাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক ও পুনরাবৃত্তির
বিষয়টি সহজে যাচাই করতে পারেন, সেজন্য আধুনিক তথ্যভান্ডারও তৈরি করা প্রয়োজন।’
ঢাকা জজ আদালতের আইনজীবীদের একাংশের অভিমত, কোনো ব্যক্তি যদি একাধিক
অপরাধে জড়িত থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা
দেয় তখনই, যখন একই সময়ের ঘটনা ঘিরে ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন মামলার অস্তিত্ব সামনে
আসে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি মামলার ভিত্তি, অভিযোগের স্বতন্ত্রতা এবং
তদন্তের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হতে হবে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচার শুরুর আগেই যদি কোনো ব্যক্তি বছরের
পর বছর কারাগারে থাকেন, তাহলে সেটি মানবাধিকারের প্রশ্নও তৈরি করে। তাদের মতে, অপরাধীকে
বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াও হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং
হয়রানিমুক্ত। না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারব্যবস্থা নিয়ে অনাস্থা সৃষ্টি হতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে একাধিক মামলার ভয় দেখিয়ে কিংবা গ্রেপ্তারের
আশঙ্কা তৈরি করে অর্থ লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা
সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও, বিভিন্ন সময় অভিযুক্ত
ব্যক্তি, তাদের পরিবার কিংবা রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ধরনের দাবি সামনে এসেছে।
এসব অভিযোগ থেকেই ‘মামলা বাণিজ্য’ শব্দবন্ধটি জনপরিসরে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক,
অভিযোগের পুনরাবৃত্তিই একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। কারণ বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা
নির্ভর করে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ওপর। যদি মানুষ মনে করে, মামলা বা গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া
কোনো ধরনের প্রভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাহলে
পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।