আদালতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার
মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫২ এএম
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৪০ এএম
বিচারব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ ছিল আশাজাগানিয়া। কিন্তু বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি লাঘব এবং প্রক্রিয়াকে সহজ করার এই উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আদালতের বিচারকার্যে গতি বাড়ছে না। উচ্চ আদালতে প্রযুক্তি ব্যবহারের একটা প্রবাহ তৈরি হলেও অধঃস্তন আদালতগুলোর অবস্থা বেশ নাজুক। প্রায় ১৮ কোটি লোকসংখ্যার এই দেশে ৪০ লাখেরও বেশি মামলার জট কমাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে আছে আদালতগুলো।
মামলার বিচার, বিচারিক অনুসন্ধান,
দরখাস্ত বা আপিল শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক গ্রহণ, আদেশ বা রায় প্রদানকালে পক্ষগণের
ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আদালতকে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা
প্রদান করে রাষ্ট্রপতির জারি করা অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয় ২০২০ সালে ৯
মে। পরে আইন মন্ত্রণালয় আদালতে ‘তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০’-এর গেজেট প্রকাশ
করে। মূলত এদেশের বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হয় বাদী-বিবাদী, সাক্ষী সবার শারীরিক উপস্থিতিতে।
করোনার সময়ে এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাদী-বিবাদী ও আসামির সশরীরে উপস্থিতি ব্যতীত আদালতে
বিচারকাজ পরিচালিত হয়।
আদালতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে
সীমাবদ্ধতা : গত বছরের ৩ ডিসেম্বর
ওয়েবসাইটের এক চিঠিতে দেখা যায়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট ও উন্নয়ন
অনুবিভাগ থেকে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৭ এর জন্য চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রযুক্তিপণ্য
কেনার জন্য মাত্র ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত ৩০ নভেম্বরের আরেক চিঠিতে দেখা
যায়, খাগড়াছড়ি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের জন্য একই অর্থবছরে ১ লাখ ৫
হাজার টাকা বরাদ্দ করা হলেও কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয় ও মেরামত বাবদ মাত্র ১৫ হাজার টাকা
বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রায় প্রতিটি আদালতের প্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনার এই স্বল্প বরাদ্দের
বিষয়টির দৈন্য প্রমাণ করে দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা
বারের এক আইনজীবী জানান, নিম্ন আদালতে শুনানির ক্ষেত্রে শুরু থেকেই কিছুটা সমস্যায়
পড়েছেন প্রবীণ আইনজীবীরা। পূর্ব প্রস্তুতি, লজিস্টিক সাপোর্টসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা
না থাকায় ডিজিটাল এই পদ্ধতিতে বিচারকার্যে অংশ নিতে অনীহা রয়েছে অনেকের মধ্যে। এছাড়া
অনেক প্রবীণ আইনজীবীর স্মার্টফোন, ওয়েবক্যাম, স্ক্যানারÑ এগুলো চালানোর বিষয়ে সঠিক
প্রশিক্ষণ নেই। তাই আইনটি স্মার্ট ও যুগোপযোগী করা দরকার। আইন বাস্তবায়নে বিচারক, বেঞ্চ
সহকারী, আইনজীবী, পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষ প্রত্যেককেই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি।
তিনি আরও জানান, আইন অনুযায়ী কাজ
করতে আদালতের বাইরে গেলে মক্কেল এবং বিচারব্যবস্থার গোপনীয়তা নষ্টের আশঙ্কা রয়েছে।
আইনে বলা হয়েছে, নারী ও শিশুর শুনানি বিচারকের খাসকামরায় হতে হবে। অনেক মামলার জামিন
বা শুনানির সময় আসামির জবানবন্দির তথ্য জনসমক্ষে উপস্থাপন করতে হলে মামলার তদন্ত কার্যক্রমের
গোপনীয়তা নষ্ট হয়। সর্বোপরি কোনো সফট কপি আদালতের বাইরের কোনো কম্পিউটারে থেকে গেলে,
সেটি বিচারিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সে
কারণে এই আইন বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিতে হবে।
তিনি বলেন, অবকাঠামোগত সমস্যা একটা
বড় বাধা। বিশেষ করে নিম্ন আদালতে স্থায়ী ও আধুনিক অবকাঠামো নেই, দ্রুতগতির ইন্টারনেট
সংযোগ নেই। তাছাড়া পর্যাপ্ত কম্পিউটার এবং সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা এখনও সামঞ্জস্যপূর্ণ
নয়। বিচারক, আইনজীবী এবং আদালতের কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার অভাব রয়েছে
বলে তারা মনে করছেন। দরিদ্র বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিচারপ্রার্থীদের জন্য প্রযুক্তির
সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা একটা চ্যালেঞ্জ।
এসব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ
আইনজীবী ও বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল
বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আদালতের কাজ পরিচালনা করলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি
হওয়া সম্ভব। তবে সব ধরনের মামলার বিচারিক কার্যক্রম এই তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে করার
ক্ষেত্রে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হতে পারে। যেমন
দেওয়ানি মামলা, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কিংবা যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামির হাইকোর্টে দায়েরকৃত
কোনো আপিল শুনানির সময় নিম্ন আদালতের রেকর্ড দেখার প্রয়োজন পড়ে। অনেক সময় সেসব রেকর্ড
এবং তথ্য-প্রমাণের সত্যতাও নির্ধারণ করার প্রয়োজন হয়। খোলা চোখে যেকোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ
যেভাবে সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেটা করা সম্ভব নয়। এটা হলো তথ্যপ্রযুক্তি
ব্যবহারের একটা নেতিবাচক দিক। তবুও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে
প্রথমদিকে কোনো মামলার উৎপত্তিস্থল থেকে শুরু করে আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত পুরোটা যদি
ডিজিটালাইজ করা যায়, তাহলে তথ্যপ্রযুক্তির ফলটা পাওয়া যাবে। ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে
থানায় মামলা হওয়া, কোর্টে পিটিশন দায়ের, তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীÑ সবকিছু শুরু থেকে
ডিজিটালাইজড পদ্ধতিতে হলে আদালতে এসে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ সমস্যার সম্মুখীন
আমরা হব না।
এই আইনজীবী আরও বলেন, প্রযুক্তি
ব্যবহারের মাধ্যমে আসামিদের সশরীরে আদালতে উপস্থিতি রহিত করা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে
ম্যাজিস্ট্রেটরা কোনো রিমান্ড শুনানি বা কোনো আসামির অনুপস্থিতিতে শুনানি গ্রহণ করছেন
শুধু ডিজিটালি তার উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে নয়। তথ্যপ্রযুক্তির
সর্বোচ্চ ব্যবহার করে কোনো সাক্ষী ও আসামির ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেসি লিখে ডিজিটাল
ফর্মে নেওয়া গেলে পরবর্তীতে কোনো আসামি বা সাক্ষী তার পূর্বে দেওয়া সাক্ষ্য থেকে সরে
যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না।
ঢাকা আদালতের আইনজীবী সাব্বির হোসেন
বলেন, নিম্ন আদালতের সেবাপ্রার্থীরা এখনও তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা সেভাবে পাচ্ছে না।
কারণ এখানে দক্ষ জনবলের অভাব এবং এর প্রচার ততটা হয়নি। দক্ষ জনবল থাকলে আদালতের নিজস্ব
ওয়েবসাইটে এই সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত করা হতো এবং প্রচার-প্রচারণা করা
হতো। এতে মামলা সংক্রান্ত সকল আপডেট তারা জানতে পারত। এই বিষয়টা সম্পূর্ণভাবে প্রচারহীন
অবস্থায় রয়েছে। তবে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রান্তিক পর্যায়ের বিচারপ্রার্থীরা এর
সুফল ভোগ করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার
পুরোদমে বাস্তবায়ন হলে আইনজীবীদের দক্ষতা বাড়বে, ভালো আইনজীবীর সংখ্যা বাড়বে। দ্রুত
বিচার নিষ্পত্তি হবে, বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা থাকবে না। একটা অপরাধ, দ্বন্দ্ব
কিংবা আইনি বিষয়, যেটা সাক্ষীর অভাবে বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মাঝপথে মুখ থুবড়ে
পড়ে, সেগুলো থেকে আমরা মুক্তি পাব।
ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী ফারজানা
ইয়াসমিন রাখি বলেন, আপাতত তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা বলতে ডিজিটাল হাজিরার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
তথ্যপ্রযুক্তি অধ্যাদেশ সেভাবে কার্যক্রম বিস্তৃত করতে পারেনি। মামলার নথিভুক্তির তথ্যসহ
আনুষঙ্গিক বাদী-বিবাদীর মোবাইল ফোনে বার্তা যাওয়া, ওয়েবসাইট তদারকি ও আপগ্রেড করাসহ
এসব কাজে লোকবল সংকট রয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়া এসব কাজে মন্ত্রণালয় থেকে বাজেট-স্বল্পতার
কথাও তুলে ধরেন এই আইনজীবী।
অধ্যাদেশটি যুগোপযোগী হলেও কাঠামোগত
সুবিধা না থাকায় সুফল সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের আইনজীবীরা।
তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, মনিটর, ইন্টারনেট সংযোগ কিছুই নেই চট্টগ্রামের আদালতগুলোতে।
এই বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার বিষয়ে জোর দেন তারা।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির
সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হাসান আলী চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই অধ্যাদেশটি
অত্যন্ত যুগোপযোগী। কিন্তু আদালতে ইন্টারনেট সংযোগ নেই; যা আছে তা-ও অত্যন্ত ধীরগতির।
এমনকি প্রতিটা কক্ষে কম্পিউটার ও মনিটর থাকার কথা থাকলেও দুয়েকটি কোর্ট ছাড়া বেশিরভাগেই
তা নেই। ফলে আইন থাকলেও তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। অধ্যাদেশের যে সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা
আমাদের ছিল, তার মাত্র ১ শতাংশ পাচ্ছি। স্ট্রাকচার উন্নত করলে এর সুফল পাওয়া যাবে।’
চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের
সরকারি কৌঁসুলি মফিজুল হক ভূঁইয়া বলেন, এটি এখন পর্যন্ত কাগজে সীমাবদ্ধ। প্রয়োজনীয়
লজিস্টিকস নেই। ফলে সুফলও নেই। এসব বিষয়ে বলা হয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আশা করি,
দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান হবে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, এই
আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে আদালতে মানুষের বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে বিড়ম্বনা এবং
লাখ লাখ মামলার স্তূপ, এ থেকে রক্ষা পাওয়া অন্যতম মাধ্যম হতে পারে তথ্যপ্রযুক্তি। যদিও
সেটি একমাত্র মাধ্যম হবে না।