মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৫৮ এএম
আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:০৬ পিএম
আপিল বিভাগ, হাইকোর্ট বিভাগ ও অধস্তনÑ সব আদালতে মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ছবি: সংগৃহীত
প্রায় ৪৭ লাখ মামলা নিয়ে নতুন বছর শুরু করেছে বিচার বিভাগ। বিগত বছরগুলোর মতো নিম্ন ও উচ্চ আদালতের মামলা জট কাটিয়ে ওঠা বিচার বিভাগের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আপিল বিভাগ, হাইকোর্ট বিভাগ ও অধস্তনÑ সব আদালতে মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহারসহ প্রতি বছর মামলার সংখ্যা কমানোর আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কোনো কাজে আসছে না। এর প্রভাব পড়ছে সমগ্র বিচারব্যবস্থার ওপর, মামলার পাহাড় জমছে উচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালতের ওপর।
২০১৯ সালের জাতীয় সংসদে দেওয়া এক তথ্য অনুযায়ী, দেশের উচ্চ আদালত ও অধীনস্থ আদালতে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৫০।
এর মধ্যে ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ছিল ২০ লাখ ৪৮ হাজার ৬৭। যার মধ্যে আপিল বিভাগে ২০ হাজার ৪৪২ ও হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ১৬ হাজার ৬৫২। আর নিম্ন আদালতে ৩০ লাখ ৩২ হাজার ৬৫২ মামলা বিচারাধীন ছিল।
জাতীয় সংসদে ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের আদালতে ৪০ লাখ ৪ হাজার ৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে দেওয়ানি মামলা ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ৭৯০, ফৌজদারি ২৪ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ এবং অন্যান্য ১ লাখ ১৮ হাজার ১৮৯টি।
সুপ্রিম কোর্টের সূত্রমতে, শুধু ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত হাইকোর্টে মামলা ছিল ৬ লাখের বেশি। নিম্ন আদালতগুলোতে ছিল ৪০ লাখ। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী সারা দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৬ লাখ ৫২ হাজারে।
এর এক বছর আগে এটা ছিল ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন মামলা ছিল ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫১০টি। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিচারাধীন মামলা বেড়ে হয়েছে ৪৬ লাখ ৫২ হাজার ২৬০টি।
নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী শপথ নেওয়ার পর গত ৪ জানুয়ারি প্রথম কার্যদিবসে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে, মামলা জট কমাতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন।
তিনি বিচার বিভাগের দুর্নীতি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন।
উচ্চ ও নিম্ন আদালতের আইনজীবীরা জানান, তারা যখন মামলা করেন, তখন অনেক সময় তার সারবত্তা কার্যকর থাকে না। তা সত্ত্বেও বছরের পর বছর মামলাটি চালিয়ে নেওয়া হয়। আবার এমন অনেক মামলা আছে, যেগুলো প্রচলিত বিচারিক সিদ্ধান্তের বাইরে, যা চূড়ান্ত বিবেচনায় গেলে এই মামলা থেকে বিচারপ্রার্থীর কোনো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তা সত্ত্বেও এই সেগুলো জিইয়ে রাখা হয়।
জানা যায়, ১১তম সংসদ নির্বাচনের বহু মামলা এখন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে অপেক্ষমাণ। অথচ সেগুলোর কোনো সারবত্তা বা কার্যকারিতা নেই। মামলা জটের অনেক বড় কারণ মিথ্যা মামলা। এছাড়া বিচারকের স্বল্পতা, লজিস্টিক সাপোর্ট কম এবং জেলা আদালতে এজলাসের স্বল্পতার কারণে মামলা নিষ্পত্তিতে গতি খুবই কম।
জানা গেছে, ময়মনসিংহে পুলিশ বাদী হয়ে গত দুই বছরে দুটি আদালতে ২৩০০টি মামলা করেছে। এর মধ্যে একটি মামলারও নিষ্পত্তি হয়নি। ময়মনসিংহে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও জজ কোর্টে পুলিশ ২০২৪ সালে ১২০০ মামলা করেছে। আর ২০২৫ সালে করেছে ১১০০ মামলা।
এ বিষয়ে জেলার সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) অ্যাডভোকেট মো. আজিজুল হক বলেন, সমন জারি, চার্জশিট প্রস্তুত, মামলার জবাব দেওয়ার আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়াসহ একটি মামলা নিষ্পত্তি করতে দু-তিন বছর লাগে।
এ বিষয়ে জেলার জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম সারওয়ার হেলাল বলেন, আদালতে মোকাদ্দমার চেয়ে বিচারক কম। আর সমন জারি করতে অফিসের কর্মচারীরা উপরি অর্থের জন্য দীর্ঘ সময় নোটিস টেবিলে আটকে রাখায় মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগছে।
রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার বিভিন্ন থানার পুলিশ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ৯ হাজার ৯৫৪টি মামলা করেছে।
এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৪৯ এবং ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত মামলা হয়েছে ২ হাজার ৯০৫টি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি অফিসের ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট ইউনিট। এসব মামলা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।
জেলার কয়েকজন আইনজীবী ও পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত রিপোর্ট সময়মতো না পাওয়া, সাক্ষীর অভাব মামলাজট কমানোর প্রধান অন্তরায়।
এ প্রসঙ্গে রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র রফিকুল আলম বলেন, যেসব মামলায় মেডিকেল রিপোর্ট, ডিএনএ রিপোর্ট, বিশেষজ্ঞের মতামত, ফরেনসিক রিপোর্ট প্রয়োজন হয়Ñ সেসবে কিছুটা বিলম্ব হয়।
জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রইসুল ইসলাম জানান, মামলাগুলো অপেক্ষমাণ ও ঝুলে থাকার অন্যতম কারণ তদন্ত প্রতিবেদন এবং সাক্ষীদের সময়মতো উপস্থিত না হওয়া।
রংপুরে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাষ্ট্র বাদী হয়ে ২৩ হাজার মামলা করেছে। রংপুর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে আমলি ও বিচারিক আদালতে মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ৭১৯টি।
জেলা সরকারি কৌঁসুলি আফতাব হোসেন বলেন, রাষ্ট্র বাদীÑ এমন মামলার সমন জারি, চার্জশিট দেওয়া, সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপনসহ কিছু কিছু মামলার রায় পর্যায়ে যেতে ৩-৪ বছর লেগে যায়।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বার কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বাংলাদেশে মামলার স্তূপ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে শুধু বিচারক বাড়িয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে জট কমানো সম্ভব না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের উৎসে হাত দিতে হবে। হয়রানিমূলক মামলায় অভিযুক্ত করা যাবে না। দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রতার ক্ষেত্রে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ ম্যাকানিজম কার্যকর করতে পারলে জট অনেকাংশে কমানো যাবে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, অনেক আইনজীবী বিচারিক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। বিচার বিভাগ দুর্নীতিমুক্ত না হলে মামলার জট কমবে না।
বিপুল মামলাজট নিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, প্রত্যেক আদালতে একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী মিথ্যা অভিযোগে মামলা রুজুর মতো অসৎ কাজে জড়িত। আন্দোলন সংগ্রাম করেও খুব বেশি উন্নতি হয়নি।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী মাহফুজুল হক সুপণ বলেন, কোনো সরকারের পক্ষেই বিপুল পরিমাণ মামলাজট কমানো সম্ভব না। বর্তমানের চেয়ে ৫ গুণ বেশি বিচারক নিয়োগ দিয়েও এটা সম্ভব না।
তিনি এ বিষয়ে আরও বলেন, মানুষ যেসব মামলা করে, তার ৯৪ শতাংশ টেকে না। একই জমির মালিকানা নিয়ে ১০-১২টি মামলা হয়। আইনজীবীদের পরামর্শে প্রচুর মামলা হয়ে থাকে। ভূমি বিষয়ক আইন ব্যাপক সংস্কার দরকার, তাহলে মামলার সংখ্যা কমে যাবে। এ ছাড়াও গ্রাম্য সালিশ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে।
আইনজীবীরা বলছেন, এখন বিচারপ্রার্থীরা জেলা আদালতের পরে উচ্চ আদালতে রিভিউ পর্যন্ত দেখতে চান। আগে ১০ শতাংশ মামলা রিভিউ পর্যন্ত আসত। এখন আসে ৯০ শতাংশ। যা মামলার জট তৈরি করে। তারা মনে করেন, সুশাসন না হলে মামলার সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।