সাগর-রুনি হত্যা মামলা
শাহরিয়ার জামান দীপ
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৫ ১০:১৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। পুলিশ ও র্যাবসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করেছে। এখন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত করছে। কিন্তু ১৩ বছর ৬ মাসেও আলোর মুখ দেখেনি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন।
হত্যার ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে এ মামলা তদন্ত করছিল শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। চার দিন পর মামলার তদন্তভার ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার ৬২ দিনের মাথায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এরপর আদালত র্যাবকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন। এ সময় তদন্তকারী সংস্থা র্যাব আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া নিয়ে কেবল সময়ই চেয়েছে। ২০১২-১৮ পর্যন্ত র্যাবের তদন্তের ফল ছিল ‘শূন্য’। আদালতের নির্দেশে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর মামলার আগের তদন্ত সংস্থা র্যাবের কাছ থেকে মামলার নথিপত্র বুঝে নেয় পিবিআই। শুরু হয় নতুন করে তদন্ত।
পিবিআই সূত্র জানায়, তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর পিবিআই নথিপত্র নিয়ে বিশ্লেষণ ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগার থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুনিকে পেছন থেকে ডান হাত দিয়ে পেটের ডান পাশে কোপ দেওয়া হয়েছে। তার পরনের টি-শার্টে ওই ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া গেছে। সবুজ রঙের ওড়না দিয়ে সাগরের হাত-পা বাঁধা ছিল। সেখানে আরেকজনের ডিএনএ পাওয়া গেছে। পিবিআই এখন অজ্ঞাত পরিচয় ওই দুই ব্যক্তির ডিএনএ মেলাতে সন্দেহভাজনদের খুঁজছে।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, সাগর-রুনির সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সম্পত্তিগত, পেশাগত শত্রুতার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাদের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না। তারা কর্মজীবনে কখনও হুমকি পাননি। গ্রেপ্তার তানভীর সাংবাদিক রুনির পূর্বপরিচিত হলেও খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ব়্যাব তাদের প্রাপ্ত তথ্য ও আলামত আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। আমরা এখন এই হত্যাকাণ্ডের সবদিকই তদন্ত করে দেখছি। তবে নতুন কোনো অগ্রগতি নেই।
এদিকে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর এ মামলার তদন্তে চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। টাস্কফোর্সকে মামলার তদন্ত ছয় মাসের মধ্যে শেষ করে হাইকোর্টে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও, এখনও জমা হয়নি। টাস্কফোর্সের প্রধান ও পিবিআইয়ের প্রধান মো. মোস্তফা কামাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, খুনের রহস্য উদঘাটন হওয়ার মতো এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দিতে টাস্কফোর্স আদালতের নির্দেশমতো কাজ করছে।
মামলার বাদী ও রুনির ভাই নওশের আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তদন্তকারী সংস্থা আমার সঙ্গে কয়েকবার কথা বলেছে। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে, সরকার ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে পারবে। তবে তদন্তের ফল না পাওয়া পর্যন্ত আশাবাদী হতে পারছি না।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাগর-রুনি খুনের মামলায় এখন পর্যন্ত মোট আটজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেনÑ রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, আবু সাঈদ, মিন্টু, কামরুল হাসান ওরফে অরুণ, সাগর-রুনির ভাড়াবাসার নিরাপত্তা প্রহরী এনামুল, পলাশ রুদ্র পাল এবং রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমান। তাদের মধ্যে প্রথম পাঁচজনই মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র হত্যার ঘটনায় র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে তাদের সাগর-রুনি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বর্তমানে তানভীর, পলাশ রুদ্র জামিনে মুক্ত আছেন। অন্যদিকে মিন্টু এ মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও অন্য মামলায় কারাগারে আছেন। হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাঁট, সাগরের হাত বাঁধা ওড়না ও রুনির পরনের কাপড় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছিল র্যাব। পাশাপাশি সাগর-রুনির ভাড়াবাসার ভাঙা গ্রিলের অংশ, ঘটনাস্থলে পাওয়া চুল, ভাঙা গ্রিলের পাশে পাওয়া মোজা, দরজার লক, দরজার চেইন ও ছিটকিনির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সেখানে পাঠানো হয়। হত্যায় সন্দেহভাজন কয়েক ব্যক্তির ডিএনএ নমুনাও যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। পরে এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন র্যাবের কাছে আসে। হত্যার ঘটনায় বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ১৬০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে র্যাব; কিন্তু খুনি শনাক্তের জন্য ক্লু পায়নি।
এদিকে সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমরা একেবারে অন্ধকারে আছি। আমরা সবসময়ই ন্যায়বিচার চাই। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় কেউ আছে। তাই বের কেরতে এতদিন সময় লাগছে, যদি কোনো চোর বা ডাকাত এটি করত, তবে অনেক আগেই এটি প্রকাশ পেত।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান সরকার ইচ্ছা করলে নির্দেশনা জারি করতে পারে, যে ঘটনাই ঘটুক না কেন তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে আনতে হবে। তদন্তকারী সংস্থার উচিত হবে আর সময় নষ্ট না করে দ্রুততম তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া।