আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২২ ২০:৫৬ পিএম
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২২ ২২:২৫ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন
অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত মার্কিন মুলুক। কমছে প্রবৃদ্ধি। বাড়ছে বেকারত্ব। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মূল্যস্ফীতিও। করোনা মহামারির পর গত আড়াই বছরেও ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশটি। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা ও দাবানলও পিছু ছাড়ছে না। পাশাপাশি বন্দুক সহিংসতা, অভিবাসন, উগ্র জাতীয়তাবাদে জর্জরিত বিশ্ব মোড়ল দেশটি। এর মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাড়ছে জ্বালানির দাম। এতসব সংকটে দেশে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে। আর রাশিয়া-চীনের কৌশলগত মিত্রতার কারণে বহির্বিশ্বেও যুতসই মোড়লগিরি করতে পারছে না ওয়াশিংটন। এমন প্রেক্ষাপটে নাইন-ইলেভেন হামলার অন্যতম অভিযুক্ত আল কায়দা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরিকে হত্যা বাইডেনের জন্য কিছুটা স্বস্তি এনেছে।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা দেন, আফগানিস্তানে ড্রোন হামলায় আল কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরিকে হত্যা করা হয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েও যুদ্ধ-বিধ্বস্ত আফগানিস্তানকে আবার সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হতে না দেওয়ার অঙ্গীকারের বৈধতা হিসাবে তিনি এই হত্যাকাণ্ডটি তুলে ধরেছেন। বিষয়টি পরিষ্কার করার আগে জানতে হবে কে এই আয়মান আল-জাওয়াহিরি। আর কেনইবা তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ। যিনি আত্মঘাতী বিমান হামলার পর ২১ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চোখকে ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে ছিলেন বলে মনে করা হয়।
৯/১১ হামলায় বেঁচে থাকা আমেরিকানরা হয়তো আল-জাওয়াহিরির নাম জানেন না। তবে অনেকের কাছেই দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তার মুখটি পরিচিত। চশমা পরা একজন ব্যক্তি, মুখে সামান্য হাসিÑ যাকে ছবিতে বিন লাদেনের পাশে দেখানো হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বরে হামলার জন্য আত্মঘাতী হামলাকারীদের তহবিল সংগ্রহ এবং কয়েক বছরের গোপন পরিকল্পনার পেছনে তিনি ছিলেন বলে দাবি করা হয়। জাওয়াহিরি নিশ্চিত করেছিলেন, আল-কায়েদা বিশ্বব্যাপী পুনরায় আক্রমণের জন্য প্রস্তুত আছে।
এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯/১১-এর পর আল-জাওয়াহিরি আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চলে পুনরায় আল-কায়েদার নেতৃত্ব গড়ে তোলেন। তিনি ইরাক, এশিয়া, ইয়েমেন এবং এর বাইরে অনেক শাখার সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন। ৯/১১-এর পর আল-কায়েদা বছরের পর বছর ধরে বালি, মোম্বাসা, রিয়াদ, জাকার্তা, ইস্তাম্বুল, মাদ্রিদ, লন্ডন এবং এর বাইরে অনেক জায়গায় আক্রমণ চালিয়েছিল। ২০০৫ সালে লন্ডনে ৫২ জন নিহত হওয়ার হামলা পশ্চিমে আল-কায়েদার সর্বশেষ বিধ্বংসী হামলার একটি। এসব কারণেই আল-জাওয়াহিরি আল-কায়েদার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাথাব্যথার কারণ’ ছিলেন। ২০১১ সালে পাকিস্তানে এক মার্কিন অভিযানে আল কায়দা প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর তিনিই এর প্রধানের দায়িত্বে চলে আছেন।
সোমবার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহরিকে হত্যার ফলে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলায় নিহতদের পরিবারের জন্য আরও একটি প্রতিশোধ নেওয়া হলো। আফগানিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করার পর বাইডেন এ মন্তব্য করেন।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের অনেক ব্যর্থতাকে গোপন করতেই এই হত্যাকাণ্ড। যখন তার বিপর্যয়কর আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের বার্ষিকী ঘনিয়ে আসছে, সৌদি আরব সফরে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সমালোচিত হয়েছেন; ইউক্রেন সংকটে রাশিয়াকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আরও বিস্তৃতভাবে বলা যায়, এ হামলা, যা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা শোনায়, কিন্তু বাস্তবে বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের উত্তেজনার এক মুহূর্তের সঙ্গে মিলে যায়, যা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে গভীর দুর্বলতা সূচনা করে।
এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণকারী সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করা ওয়াশিংটনের বিশ্বের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির সাংগঠনিক নীতি ছিল। সোমবারের সংবাদটি তেমনি একটি ‘মিশন সম্পন্ন’ মুহূর্ত ছিল। কিন্তু এমন সময়ে এই খবর প্রকাশ করা হলো, যখন এশিয়া সফর করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। তিনি তাইওয়ানে যেতে পারেন, এমন খবরে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। মার্কিন ওই কর্মকর্তা তাইপে সফর করলে চীনের সামরিক বাহিনী চুপ করে থাকবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে বেইজিং। এমনকি সম্প্রতি দুই দেশের প্রেসিডেন্টের ফোনালাপেও কড়া বার্তা দিয়েছে বেইজিং। বাস্তবে যখন চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হচ্ছে, তখনই জাওয়াহিরির হত্যার প্রকাশ করে ‘নড়বড়ে’ প্রেসিডেন্ট বাইডেন একটি বোনাস পয়েন্ট নিতে চাইছেন।
আরও স্পষ্ট করে বললে, জাওয়াহিরির মৃত্যু বাইডেন এবং তার টালমাটাল সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত উপস্থাপন করে। এটির মাধ্যমে এক বছর আগে আফগানিস্তান থেকে বিশৃঙ্খল মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের বেদনাদায়ক স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। এটি তার প্রশাসনকে এ মাসের শেষের দিকে সেই বৈদেশিক নীতির ব্যর্থতার বার্ষিকী সংশ্লিষ্ট পর্যালোচনাগুলো কী ক্ষতিকর করছে, তা পুনর্নির্মাণ করতে সহায়তা করতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে অভিযানটি ‘দিগন্তের ওপার থেকে’ আফগানিস্তানে মার্কিন শত্রুদের লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হওয়ার বাইডেনের দাবিকে সমর্থন করে। সূত্র: সিএনএন ও রয়টার্স।