বিশ্লেষণ
প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২২ ১২:১২ পিএম
আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২২ ১৩:৫৬ পিএম
২০২২ সালে আসিয়ান নেতাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউজে বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন বাইডেন। ছবি; সংগৃহীত
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দৃঢ় বৈদেশিক নীতি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। বেইজিংয়ের উঠোন হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলজুড়ে দেশটির ক্ষমতা যতো বেড়েছে, ততো অস্বস্তি বেড়েছে ওয়াশিংটনের। দীর্ঘ কয়েক বছরের দুই পরাশক্তির মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর যুক্তরাষ্ট্র ফের এই অঞ্চলের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পদক্ষেপগুলো এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই সপ্তাহে কম্বোডিয়ায় অনুষ্ঠিত অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস বা আসিয়ানের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ২০১৭ সালের পর এ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা তিনিই প্রথম মার্কিন নেতা।
যদিও গত বছর ভার্চ্যুয়ালি এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন হোয়াইট হাউসের এই নেতা। আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্কের অগ্রগতি নিশ্চিত করে চীনের উঠোনে নিজের দাপট ধরে রাখার কূটনেতিক চাল নিশ্চিতের চেষ্টা চালাচ্ছে ওয়াশিংটন।
চীন তার উঠোনে যে দাপট দেখিয়ে চলেছে তা নিয়ে কিছুদিন বেশ হুমকি-ধমকি দিলেও এখন সুর নরম করতে দেখা যাচ্ছে ওয়াশিংটনকে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে চীনের সমর্থন, তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকলো, এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে তোড়জোড় শুরু করলেন বাইডেন।
এমন পরিস্থিতিতে বেইজিংয়ের উঠোনের আরেক প্রভাবশালী দেশ ইন্দোনেশিয়ায় সফরে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেখানে জি২০ সম্মেলনে অংশ নেবেন বাইডেন। আর সম্মেলনের আগে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করবেন বলেও জানায় হোয়াইট হাউস।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের আসন্ন বৈঠক নিশ্চিত করতে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিবিসি জানিয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর এটিই হবে শি এর সঙ্গে তার প্রথম মুখোমুখি বৈঠক।
তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ‘বেশি বিশ্বাসঘাতক কূটনৈতিক পরিবেশে’ কাজ করছে। কিছু সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্বের পুরো রাজনৈতিক পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে নতুন নতুন মোড় নিচ্ছে।
আসিয়ান যা একসময় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কূটনীতির জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হত। এখন সংস্থাটি ক্রমবর্ধমান মেরুকৃত বিশ্বে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ ধারা কার্যকর রাখতে ১০ সদস্য রাষ্ট্রবিশিষ্ট আসিয়ান নিজেদের শান্ত ও নিরপেক্ষ রেখেছে ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে, একে অপরের সমালোচনা এড়িয়ে চলে এবং নির্দ্বিধায় বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে।
সদস্যগুলোর ওপর কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে জোর দেওয়ার সাহস না থাকা আসিয়ানের বড় দুর্বলতা।
তবে এতে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রভাব ছিল তখন দৃঢ় অবস্থান ছিল সংস্থাটির। মার্কিন নেতৃত্বের কারণে বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধিতেও উন্নতি হয়েছিল।
কিন্তু বিশ্ববাজারে চীনের আগমন এবং ২০০০ দশকের গোড়ার দিকে এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কমিয়ে দেয় এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।
চীনের সাবেক নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের মন্ত্র 'নিজের শক্তি লুকিয়ে রাখ এবং সঠিক সময়ের অপেক্ষা করো' এই নীতি অনুসরণ করে বেইজিং এ অঞ্চলে মনোমুগ্ধকর প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে। তবে জিনপিংয়ের ১০ বছর ধরে ক্ষমতা চর্চা চীনের যে শক্তি আর গোপন রাখতে পারেনি।
গত এক দশকে দক্ষিণ চীন সাগরে রিফ দ্বীপপুঞ্জে চীনের দখলদারিত্ব ও সামরিক অগ্রগতি এ দ্বীপের অন্যান্য দাবিদারদেরকে সরাসরি দ্বন্দ্বে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনকে।
এই বিবাধ ঠেকাতে আসিয়ান ‘আচরণবিধি’ ঠিক করে দিলেও সে প্রচেষ্টা ধোপে টেকেনি। বেইজিং ২০ বছর ধরে এ প্রসঙ্গে আলোচনা স্থগিত করে রেখেছে। এ নিয়ে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের দেওয়া রায়কেও প্রত্যাখ্যান করেছে বেইজিং।
এ ছাড়া মেকং নদীর ওপর তৈরি করা বৃহৎ আকারের বাঁধের কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলোও এড়িয়ে গেছে প্রভাবশালী দেশটি।
তবে আসিয়ান গঠন করা দেশগুলো এসব বিষয় নিয়ে চীনের সঙ্গে মন কষাকষিতে আগ্রহী নয়। তার কিছু কারণও রয়েছে। প্রথমত, চীন অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সামরিকভাবে এত শক্তিশালী যে খুব কম দেশই প্রকাশ্যে দেশটির সঙ্গে ঝামেলায় জড়ানোর সাহস করে।
এমনকি ৪৩ বছর আগে চীনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানো চিরবৈরী রাষ্ট্র ভিয়েতনামও দেশটির সঙ্গে কী আচরণ করবে, তা নিয়ে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে।
দ্বিতীয়ত, আসিয়ানের লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোকে বেইজিং নিজের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে। যে কারণে চীনের বিরুদ্ধে কথা তুললেই ভেঙে পড়তে পারে আসিয়ান।
২০১২ সালে কম্বোডিয়া যখন সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে, তখন চীনের প্রতি এর আচরণ এসব বিষয় আরও স্পষ্ট করে তোলে। দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের অবস্থানের সমালোচনামূলক একটি চূড়ান্ত বিবৃতি দেওয়া হয়, যা তখন কম্বোডিয়াকে অবরুদ্ধ করে ফেলে।
চীনের প্রতি সবার সতর্কতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুসংবাদ হতে পারে, তবে সত্যিটা হল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও ওয়াশিংটনের প্রতি বেশ অসন্তুষ্ট।
তারা যুক্তরাষ্ট্রকে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে শশব্যস্ত অংশীদার হিসেবে দেখে। তবে তাদের বিশ্বস্ত অংশীদার ভাবে না।
১৯৯৭ সালে এশিয়ায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে অত্যন্ত অজনপ্রিয় অংশীদার। সে সময়ে তারা এ অঞ্চলকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল এবং জর্জ বুশের সময় থেকে শুরু করা বিভিন্ন নীতি তাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে দেশটি থেকে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে কোয়াড জোট গড়ে ওই দিকে ঝুঁকে যাওয়াও আসিয়ানকে দুর্বল করে দিয়েছে। যার কারণে দুটি শক্তিশালী পক্ষের মধ্যে আটকে গেছে এশিয়ার এই সংগঠন।
আবার চীনের উঠোনে এসে ওয়াশিংটনের বেইজিংকে চ্যালেঞ্জ করা এ দেশগুলোর মধ্যে আরও ভীতি তৈরি করেছে। কারণ এই দুই পরাশক্তির মধ্যে যেকোনো ধরনের সংঘর্ষ শুরু হলে তার খেসারত দিতে হবে আশিয়ান রাষ্ট্রগুলোকেই।
এ ছাড়া চীনের সঙ্গে দেশগুলোর সম্পর্ক ইতোমধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য ব্লকের দিকে নিয়ে গেছে। কারণ এতে যুক্ত হয়েছে আসিয়ান, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডও।
আসিয়ানের বৃহত্তম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়াও চীনের বিনিয়োগ, ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চেয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বড় যোগাযোগ রয়েছে তাদের।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এটা ভেবে সান্ত্বনা পেতে পারে যে আসিয়ান চীনের পাল্টা শক্তি হিসেবে অন্যান্য শক্তিকে যুক্ত করতে পারবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো করে এখানে ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র পাওয়ার সম্ভাবনা নেই চীনের।
তবে সব আসিয়ান দেশগুলো এটাও স্বীকার করে যে চীন এই অঞ্চলে একমাত্র প্রভাবশালী শক্তি হয়ে উঠবে। আর তার নিজের স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়লে সেখানে একবিন্দুও ছাড় দিবে না বেইজিং।
এসবের পর বাইডেনের জন্য প্রশ্ন থেকে যায়, চীনের বাড়ির উঠোনে এই জোটের সঙ্গে সম্পর্ক পুননির্মাণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কি খুব দেরি হয়ে গেছে?