মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২০:৪৫ পিএম
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২১:০৮ পিএম
মিয়ানমারের কারেন রাজ্যের দেমোসো শহরঘেঁষা দাউসিই গ্রামে সোমবার জান্তার হামলায় তছনছ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির একটি শ্রেণিকক্ষের দৃশ্য।
মিয়ানমারের কারেন রাজ্যের দেমোসো শহরঘেঁষা দাউসিই গ্রামে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জান্তা বাহিনীর হামলায় অন্তত চার শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) জান্তার বোমারু বিমানের চালানো এই হামলায় আহত হয়েছে কমপক্ষে ১০ জন। জাতিসংঘের মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধ আইন অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
দেমোসো এলাকার একজন স্বেচ্ছাসেবক মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরাবতিকে জানিয়েছেন, সকাল ১০টার দিকে দাউসিই গ্রামের স্কুলে দুটি যুদ্ধবিমান দুটি বোমা নিক্ষেপ করে। একই সঙ্গে মেশিন গান থেকে গুলিবর্ষণ করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই স্বেচ্ছাসেবক বলেন, দেমোসো এলাকায় জান্তা বাহিনী ও প্রতিরোধ গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ হয়নি। তারপরও জান্তা বাহিনী স্কুল চলাকালে নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর বোমা হামলা চালিয়েছে।
দেমোসো শহরের প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে কারেন রাজ্যের রাজধানী লোইকাও যাওয়ার রাস্তায় পড়ে দাউসিই গ্রামটি। দেমোসোর অধিকাংশ এলাকা এখন কারেন ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের (কেএনডিএফ) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইরাবতির খবরে বলা হয়েছে, জান্তার বোমায় আক্রান্ত বিদ্যালয়টিতে কিন্ডারগার্টেন থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। জান্তার বিমান হামলা ও গোলাগুলি থেকে শিশুশিক্ষার্থীদের রক্ষা করার জন্য বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বোমাপ্রতিরোধী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। তবে পূর্বসতর্কতা বা সংকেত ছাড়া হঠাৎ করেই হামলা হওয়ায় শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বোমা হামলায় বিদ্যালয়টির ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। হামলায় আহত অনেক শিশুর অবস্থা গুরুতর।
দেমোসো এলাকাটি যুদ্ধ-উন্মুখ হলেও দাউসিই গ্রামটি অপেক্ষাকৃত শান্ত। তাই অন্যান্য গ্রামের উদ্বাস্তুরা দাউসিইর স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়িতে আশ্রয় পাচ্ছে। উদ্বাস্তু পরিবারের শিশুরাও দাউসিইর এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। সেই বিদ্যালয়টি হামলায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো।
জান্তার যুদ্ধবিমানগুলো দেমোসোর আরও কয়েকটি গ্রামে বোমাবর্ষণ করেছে। তবে ওইসব গ্রামে হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কো হপোন নাইং ইরাবতিকে বলেন, যুদ্ধবিমানগুলো সারা সকাল দেমোসোর গ্রামগুলোর ওপর দিয়ে চক্কর কেটেছে। সেখানে বোমা ফেলেছে এবং ঘটনাস্থলে তিন শিশু নিহত হয়েছে। অনেকে আহত হয়েছে। তবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।
অভ্যুত্থানের পর থেকে কারেন রাজ্যে জান্তার ব্যাপক বোমা হামলার প্রতিবাদে সেখানে জনপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে এবং বেসামরিক মানুষ সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। তবে জান্তা বিদ্রোহীদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাদের ওপর হামলা আরও তীব্র করে।
কারেন হিউম্যান রাইটস গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জান্তা কারেন রাজ্যে ১৬০টির বেশি গোলা হামলা এবং ৭৬ বার বিমান হামলা চালায়। এসব হামলায় ২০২২ সালে ১৮০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়, আহত হয় ১৪০ জনের বেশি।
জান্তা সৈন্য ও কর্মকর্তাদের কারেন রাজ্য থেকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে গত বছরের ১১ নভেম্বর থেকে বিদ্রোহী ও প্রতিরোধ বাহিনী ‘অপারেশন ১১১১’ শুরু করে। তখন থেকে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। এখন পর্যন্ত বিদ্রোহীরা মো বাই, মেসে ও নান মাল খোনে নামে তিনটি শহর দখল করেছে।
অ্যাডভোকেসি গ্রুপ প্রোগ্রেসিভ কারেন পিপলের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত জান্তার বিমান হামলায় ৪৬টি ধর্মীয় স্থাপনা, ২২টি বিদ্যালয়, ১৪টি হাসপাতাল এবং ২ হাজার ২৮১টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
কারেন রাজ্যের ‘অন্তর্বর্তীকালীন বেসামরিক সরকার’-এর দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর থেকে তিন বছরের তুমুল লড়াইয়ের মুখে রাজ্যের ৪ লাখ ২০ হাজার বাসিন্দার মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজারই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজ্যে জান্তার গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় পাঁচ শতাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, যার ৬৫ শতাংশই নারী ও শিশু।
অন্যান্য রাজ্যেও হারছে জান্তা
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছে ক্রমেই পরাজিত হচ্ছে জান্তা। রবিবার আরাকান আর্মির (এএ) কাছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মংডু শহরের টাং প্রো লেট ইয়ার সামরিক চৌকিটি হাতছাড়া হয়েছে জান্তার। সেখানে তুমুল লড়াই হয়।
জান্তার বাহিনী পিছু হটলে চৌকিটি দখলে নেয় আরাকান আর্মি। সেখান থেকে তারা বেশ কয়েকজন সেনার মরদেহ উদ্ধার করে। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদও আরাকান আর্মির হাতে আসে।
এ ছাড়া গত তিন দিনে মিয়ানমারের বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাতে জান্তার অন্তত ৬২ সেনা নিহত হয়েছে। একই সময়ে অনেক শহর জান্তার হাতছাড়া হয়েছে।
সূত্র : ইরাবতি ও নারিনজারা