প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ২২:০৭ পিএম
ইসরায়েলি বিভীকায় জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার হচ্ছে গাজা। মুহুর্মুহু গণবোমায় অকাতরে প্রাণ দিতে হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের। ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত বোমাবর্ষণে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৭ শতাধিক ফিলিস্তিনি হয়েছেন। অথচ নির্বিকার বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও অর্থ সহায়তায় এই নির্বিচার গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। মধ্যস্থতা করে যুদ্ধবিরতি কার্যকরে কাতার, মিসর ও অন্যদের যে প্রয়াস, তা কার্যত থমকে আছে। এ অবস্থায় ফিলিস্তিনিরা মরছে দলে দলে। গাজায় উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল জাবালিয়া শরণার্থী ক্যাম্পে রবিবারও হামলা চালানো হয়েছে। সেখানে রক্ত, মৃত্যু আর মাতমের মর্মন্তুদ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৭ অক্টোবর থেকে রক্তক্ষয়ী হামলায় উপত্যকাটির ১৫ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। রবিবার (৩ ডিসেম্বর) গাজার হামাস নিয়ন্ত্রিত সরকারের মুখপাত্র এই তথ্য জানিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির পর তিন দিন ধরে গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ইসরায়েলের হামলার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শিশুই ৭ হাজারের বেশি।
ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না দক্ষিণ গাজার মানুষও। হামলা জোরদার করার জন্য খান ইউনিসের পার্শ্ববর্তী কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেখানে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার পরিচালক থমাস হোয়াইট বলেছেন, অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলে হেপাটাইটিস এ-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
এদিকে দখল করা ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের কালকিলিয়া শহরে অভিযান চালিয়ে ২১ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
ফিলিস্তিনের প্রিজনারস সোসাইটি জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে গত শনিবার রাতভর অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এ সময় তারা অন্তত ৬০ ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে।
গাজাকে ২ হাজার ৩০০টি ছোট ছোট ব্লকে ভাগ করে নতুন উদ্যমে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। গত শুক্রবার ইসরায়েল ও হামাস যুদ্ধবিরতি বাড়াতে সম্মত হতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে এ পদ্ধতিতে হামলা চালানো হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৪৮ দিনের মাথায় ২৪ নভেম্বর ইসরায়েল ও হামাস প্রাথমিকভাবে চার দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। পরবর্তীতে তা আরও দুই দফায় তিন দিন বাড়ানো হয়। মোট সাত দিনের যুদ্ধবিরতি ১ ডিসেম্বর সকাল ৭টায় শেষ হয়। যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজার সর্বত্র বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।
যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলি বিমান হামলায় নতুন পরিবর্তন হলো, এমএমএস পাঠানো। যে স্থান বা বসতিতে হামলা চালানো হচ্ছে সেখানকার বাসিন্দারের মোবাইল নম্বরে হামলার সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। কিন্তু এটা জনগণের উপকারে লাগছে না। কারণ বিরাণভূতিতে পরিণত হওয়া উপত্যকাটির সব জায়গায় বিদ্যুৎ নেই। সবকিছু উলট-পালট হয়ে যাওয়ায় অনেকের হাতে স্মার্টফোন বা রেডিও নেই। তাই সবাইকে বেঘোরে মরতে হচ্ছে।
এদিকে সাত দিনের যুদ্ধবিরতির পর শনিবার কাতার থেকে নিজেদের প্রতিনিধিদলকে ফিরিয়ে এনেছে ইসরায়েল। এদিন এক বিবৃতিতে ইসরায়েল জানায়, যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ডেভিড বার্নিয়া কাতার থেকে প্রতিনিধিদলকে দেশে ডেকে পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে হামাস যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করেছে বলেও অভিযোগ করেছে ইসরায়েল।
কিন্তু হামাস ইসরায়েলের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে যুদ্ধ বন্ধ না করা পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে আর কোনো বন্দিবিনিময় হবে না বলেও জানিয়েছে হামাস।
সাত দিনের বন্দিবিনিময়ের মধ্য দিয়ে হামাস মোট ১১০ জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে। মুক্ত জিম্মিদের মধ্যে ইসরায়েলের নাগরিক ৭৮ জন। বাকিরা বিদেশি। একই সময়ে ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে ২৪০ ফিলিস্তিনি। উভয় পক্ষে মুক্তদের সবাই নারী ও শিশু।
তবে ২৪ নভেম্বর যুদ্ধবিরতি শুরুর পর পশ্চিম তীর থেকে ইসরায়েল অন্তত ২৩৩ ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েল যতজন ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিয়েছে প্রায় তার সমান গ্রেপ্তার করেছে। এখনও হামাসের হাতে প্রায় ১৩০ জন জিম্মি রয়েছে। ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি রয়েছে প্রায় ১০ হাজার ফিলিস্তিনি।
কাতার থেকে নিজেদের প্রতিনিধিদল প্রত্যাহারের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শনিবার উত্তর-মধ্য গাজার খান ইউনিসের হামাদ সিটিতে পাঁচটি বিমান দিয়ে বোমা হামলা চালিয়েছেন ইসরায়েল। ১১ বছর আগে কাতারের আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি শহরটির ভিত্তি প্রস্তর করেন।
২০১৬ সালে প্রকাণ্ড প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হয়। প্রথম দফায় প্রায় ১ হাজার ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুই বছর আগে ২০১৪ সালে ইসরায়েলি হামলায় উদ্বাস্তুরাই সেখানে ঠাঁই পান। শনিবারের বোমা হামলায় কোটি কোটি ডলারের প্রকল্পটি উল্লেখযোগ্য হারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে শনিবার কাতার পৌঁছেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। দুবাইয়ের চলমান জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৮ থেকে মাখোঁ কাতার যান। মাখোঁ যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চালাবেন বলে জানা গেছে।
২৪ নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছিল কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র। কাতারের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সূত্র : আলজাজিরা, আল-মনিটর