প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৩ ১২:৫৯ পিএম
আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৩ ১৩:৫৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের অবিরাম গণহত্যার ৩০তম দিনে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। সোমবার (৬ নভেম্বর) পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ২২ জন, যার মধ্যে শুধু শিশুই ৪ হাজার ১০৪ এবং নারী ২ হাজার ৬৪১ জন। আহত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। গাজায় মুহুর্মুহু বোমা হামলার মাধ্যমে জীবন-মৃত্যু যেন পুতুলখেলায় পরিণত করেছে ইসরায়েল।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরতির জোরালো আহ্বান উপেক্ষা করেই অবিরাম গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। গতকাল জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিশ্বের প্রথম সারির ১৮টি উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংস্থার প্রধানরা আর একমুহূর্তও কালক্ষেপণ না করে গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। এটি একটি বিরল পদক্ষেপ। তবে কে শোনো কার কথা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুদ্ধবিরতির আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে চলেছেন।
শুধু যুদ্ধবিরতির আহ্বান প্রত্যাখ্যানই নয়, ইসরায়েলের দিকে কেউ যাতে চোখ তুলে না তাকায়, সেটি নিশ্চিত করতে রণপ্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দুটি রণতরি পাঠানোর পর এবার মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিন পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ইসরায়েলের হয়ে দুতিয়ালি করতে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা যেন ইসরায়েলে আক্রমণ না করে, এই যুদ্ধে যেন না জড়ায়Ñ সেটি নিশ্চিত করতেই ব্যতিব্যস্ত তিনি। তবে তুরস্কে গিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে পড়েন তিনি।
ইসরায়েল গাজায় অবিরাম বোমা হামলা অব্যাহত রেখেছে। স্কুল-হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্রÑ আর কোনো স্থান নেই যেখানে ইসরায়েল হামলা চালাচ্ছে না। গাজার আল-রান্টিসি হাসপাতালে গতকাল দুবার হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ক্যানসার সেন্টার এবং বিশেষায়িত শিশু কেন্দ্রেও বোমা ফেলেছে তারা। এসব হামলায় ৪ জন নিহত এবং ৭০ জন আহত হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজন শিশু, কর্মী এবং উদ্বাস্তু রয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় আল-রান্টিসি হাসপাতালের সৌর প্যানেল এবং পানির ট্যাঙ্কও ধ্বংস হয়ে গেছে। গাজার ২৩ লাখ মানুষই এখন জীবনঝুঁকির মুখে পড়েছে। গতকাল ইসরায়েল ১৮টি হামলা চালিয়ে ২৫২ জনকে হত্যা করেছে। ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েল বোমা হামলা চালিয়ে ১৯২ মেডিকেল কর্মীকে হত্যা করেছে এবং ৩২টি অ্যাম্বুলেন্স ধ্বংস করেছে। ১৬টি হাসপাতাল আর সেবা দিতে পারছে না।
ইসরায়েল তার গণহত্যা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতাকে গ্রিন লাইট হিসেবে বিবেচনা করছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আজ বৈঠক হওয়ার কথা। সেখানে আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিন্দা জানানোর পাঁচটি প্রস্তাব ব্যর্থ হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করলে যুদ্ধবিরতি না করে উপায় থাকবে না ইসরায়েলের। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে তা হচ্ছে না।
গাজায় নজিরবিহীন গণহত্যার মধ্যে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সাবমেরিন যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ অস্ত্রে সজ্জিত। সাবমেরিনে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো এগুলো সঠিক নিশানায় আঘাত হানতে অত্যন্ত কার্যকর। একই সঙ্গে এসব ক্ষেপণাস্ত্রে পারমাণবিক অস্ত্র যুক্ত করেও নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো যায়। মার্কিন নৌবাহিনী গত রবিবার মধ্যপ্রাচ্যে সাবমেরিন পাঠানোর কথা ঘোষণা দিয়ে জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রকে সাধারণত এভাবে ঘোষণা দিয়ে সাবমেরিনের অবস্থান জানানোর কথা বলতে দেখা যায় না। সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা দেখাতে যুক্তরাষ্ট্র এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) আওতাধীন। রবিবার এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, ‘৫ নভেম্বর ওহাইও শ্রেণির একটি সাবমেরিন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাধীন এলাকাতে এসে পৌঁছেছে।’
মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো সেই সাবমেরিনের ছবিও প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর অধীন শাখা সেন্ট্রাল কমান্ড। তাতে দেখা যায়, সুয়েজ খাল দিয়ে মার্কিন সাবমেরিনটি তার গন্তব্যে যাচ্ছে।
গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালায় ফিলিস্তিনের গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাস। সেদিনই গাজায় পাল্টা হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এর পর থেকে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি ও তৎপরতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে দুটি যুদ্ধবিমানবাহী রণতরিসহ বহু যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় এক হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করারও ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ অভিযান পরিচালনায় দক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের একদল কমান্ডো সেনা গাজা যুদ্ধের জন্য ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে পরামর্শ দিচ্ছে। তবে এই কমান্ডোর সংখ্যা কত, তা জানানো হয়নি।
এখানেই শেষ নয়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব দেশগুলোতেও সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। সৌদি আরবে পাঠিয়েছে টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) নামে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এ ছাড়া কুয়েত, জর্ডান, ইরাক, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপণযোগ্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা পাঠানো হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল প্যাট রাইডার বলেছেন, (গাজা যুদ্ধের কারণে) পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যাতে যুদ্ধ ছড়িয়ে না পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়াশিংটনের মিত্রদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার কথা ভেবেই অঞ্চলটিতে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে ও হচ্ছে।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সিরিয়া ও ইরাকে মার্কিন সামরিক অবস্থান নিশানা করে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। এ সময়ে ইরানের সমর্থন পাওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এসব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নিশানা করে কয়েক ডজন হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি হামলা হয় ১৭ অক্টোবর সিরিয়ার আল-তানফ্ সেনাছাউনি এবং ১৮ অক্টোবর ইরাকে আল-আসাদ নামে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে। এই দুই হামলায় ২১ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। সূত্র : আলজাজিরা ও রয়টার্স