ইসরায়েলের আগ্রাসন
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৩ ১১:৫৯ এএম
আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৩ ১১:৫৯ এএম
গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলীয় আল-জাহরা শহরে ইসরায়েলি বোমা হামলায় মাটিতে মিশে যাওয়া ভবনের সারি।
টানা ১৪ দিন ইসরায়েলের আগ্রাসনে গাজায় চলমান গণহত্যা বন্ধের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে বিশ্ব। এরই মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার প্রতিবাদে পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশে গতকাল বিক্ষোভ হয়েছে। ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা থামানোর জন্য পক্ষে বড় বড় সমাবেশ করেছে শান্তিকামী মানুষ। বাংলাদেশ-ভারত থেকে ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া, তুরস্ক-সিরিয়া থেকে সৌদি আরব-ইয়েমেন, মিসর-মরক্কো থেকে কেনিয়া-সুদান সব দেশেই শুক্রবার (২০ অক্টোবর) ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সংহতি জানিয়ে এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন গঠনের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশে দেশেও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে সমাবেশ ও বিক্ষোভ হয়েছে।
শান্তিপ্রিয় মানুষের ডাকে সাড়া দিয়েছে কিছু দেশ। অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির উপায় খুঁজতে আজ শনিবার (২১ অক্টোবর) মিসরের কায়রোয় শান্তি সম্মেলন হওয়ার কথা। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধানসহ এরই মধ্যে ১৫টি দেশের নেতারা সম্মেলনে অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ জর্ডান, মিসর, ইতালি, জার্মানি, কুয়েত, গ্রিস, সাইপ্রাস, স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে। এসব দেশের সরকার-রাষ্ট্রপ্রধান অথবা তাদের প্রতিনিধি সম্মেলনে অংশ নেবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি হয়ে কথা বলবেন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস।
গাজায় ভয়াবহ ও বর্বর হামলার মধ্যেই ইসরায়েলকে আরও অস্ত্র ও অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ইউক্রেন ও ইসরায়েলের জন্য সামরিক সহায়তা হিসেবে ১০৬ বিলিয়ন ডলার দিতে চান তিনি। এর মধ্য থেকে ইসরায়েলকে দিতে চান ১৪ বিলিয়ন ডলার। আইনপ্রণেতারা পাস করলেই এই অর্থ চলে যাবে নেতানিয়াহু সরকারের কাছে। নিরস্ত্র বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে যা ব্যবহার করবে দেশটি।
হামাস ও পুতিনকে একযোগে পরাজিত করতে হবে : বাইডেন
গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাস ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একই জিনিস। তারা উভয়ে গণতন্ত্রের দুশমন। তাদের জিততে দেওয়া যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে এসব কথা বলেছেন। বাইডেন বলেন, ‘হামাস ও পুতিন আমাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হুমকি। কিন্তু তাদের মধ্যে বড় মিল আছে। তারা উভয়ে প্রতিবেশী দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করতে চায়।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘হামাসের মতো সন্ত্রাসী ও পুতিনের মতো স্বৈরাচারকে আমরা জিততে দিতে পারি না। জিততে দেবও না। এ ধরনের কোনো কিছু আমি হতে দেব না।’
বাইডেনের বক্তব্যে কড়া প্রতিক্রিয়া রাশিয়ার
ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ বলে জো বাইডেনের বক্তব্যের জেরে ওয়াশিংটনের কঠোর সমালোচনা করেছে রাশিয়া। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা গতকাল মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে এই সমালোচনা করেন।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন বাইডেন। ভাষণে তিনি ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে অভিহিত করেন।
বাইডেনের ভাষ্যে, এটা একটা স্মার্ট বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য লভ্যাংশ জুগিয়ে যাবে। ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে নতুন করে সহায়তা দেওয়ার জন্য তিনি কংগ্রেসের সমর্থন প্রত্যাশা করেন।
বাইডেনের এই মন্তব্যের বিষয়ে আজ প্রতিক্রিয়া জানান রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া। তিনি বলেন, বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বাইডেনের মন্তব্য প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্র আদর্শিক কারণে লড়াইয়ে জড়ায় না। তারা ছায়াযুদ্ধ (প্রক্সি ওয়ার) থেকে লাভবান হয়।
মারিয়া বলেন, বাইডেনের মন্তব্যে নৈতিক মানদণ্ডের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ পেয়েছে।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, মার্কিন প্রশাসন স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের কথা বলে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, এর পেছনে রয়েছে শুধুই হিসাব। ওয়াশিংটন মূল্যবোধের কথা বলে সব সময় বিশ্বকে বোকা বানিয়েছে। অথচ তারা কখনও এই মূল্যবোধ ধারণ করেনি।
ইসরায়েলকে বড় সামরিক সহায়তা দিতে চান বাইডেন
শুক্রবার বাইডেন কংগ্রেসে ১০৬ বিলিয়ন ডলারের জরুরি সামরিক সহায়তার একটি বিল উত্থাপন করেন। এ অর্থ আগামী এক বছরে ইউক্রেন, ইসরায়েল ও তাইওয়ানের জন্য ব্যয় করা হবে
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল সেনাবাহিনীকে নিয়মিতভাবে বছরে ৩২০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়।
শুক্রবার উত্থাপন করা জরুরি বিলকে বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন বাইডেন। তাই এ বিলকে সমর্থন করতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বাইডেন বলেন, ‘ইসরায়েল ও ইউক্রেন আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই তাদের তহবিল দেওয়া দরকার। এটা একটা স্মার্ট বিনিয়োগ। এ বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের আগামী কয়েক প্রজন্ম ধরে নিরাপত্তা দেবে। তাই আপনারা সবাই আগামীকালের (শুক্রবার) বিলকে সমর্থন করবেন।’
হোয়াইট হাউসে ভাষণ দেওয়ার আগের দিন বুধবার ইসরায়েল সফরে যান বাইডেন। সেখানে সর্বাত্মকভাবে ইসরায়েলের পাশে থাকার ঘোষণা দেন।
বাইডেনের সফরের আগের দিন মঙ্গলবার তেল আবিবে যান জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ। বৃহস্পতিবার যান যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। দুয়েক দিনের মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও ইসরায়েল সফরে যাবেন।
তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ পশ্চিমা দেশের শীর্ষনেতারা ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবিরামভাবে সফর করছেন। বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছেন।
বাইডেনসহ পশ্চিমের শীর্ষনেতারা এত তাড়াতাড়ি ইসরায়েল সফর করছেন কেন, এটা নিয়ে নানা কথা শোনা যাচ্ছে। প্রথমত ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানাতে তাদের এ সফর। দ্বিতীয়ত যুদ্ধ যাতে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করতেই তারা নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে আসছেন।
৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পরপরই পূর্ব ভূমধ্যসাগরে যুদ্ধবিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডসহ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। এ অঞ্চলের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করা হয়। এরপর সেখানে যুদ্ধবিমানবাহী দ্বিতীয় রণতরি পাঠানোর ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এ দুই রণতরিতে প্রায় ১০ হাজার সেনা রয়েছে।
তা ছাড়া ইসরায়েলের উপকূলে আরও ২ হাজার সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সংখ্যা দাঁড়াতে যাচ্ছে প্রায় ১২ হাজার।
উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী মোতায়েনের উদ্দেশ্য— ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও সিরিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সতর্ক করা। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে তাদের জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখা।
কিন্তু ইসরায়েল গাজায় পূর্ণমাত্রায় স্থল অভিযান শুরু করলে যুদ্ধ বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। ইরান এ বিষয়ে বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
নেতানিয়াহু ইতোমধ্যে ভয়ংকর প্রতিশোধ, হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়েছেন। সীমান্তে ৩ লাখ ৬০ হাজার সেনাসমাবেশ করেছেন। যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জরুরি সরকার গঠন করেছেন। উত্তর গাজা থেকে ১১ লাখ ফিলিস্তিনিকে সরাতে বারবার নির্দেশ দিচ্ছে ইসরায়েল, যা যুদ্ধাপরাধ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইওভ গ্যালান্ট শিগগির গাজা অভিযান হতে পারে বলে জানিয়েছেন। সূত্র : আলজাজিরা, বিবিসি ও গালফ নিউজ