ইসরায়েলের হামলা
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৩ ০১:১৫ এএম
আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৩ ০১:১৬ এএম
টানা ছয় দিন ইসরায়েলের নির্বিচার ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমার আঘাতে জ্বলছে গাজা। মাথা গোঁজার নিরাপদ ঠাঁই নেই কোথাও। বাসস্থান, অবকাঠামো, স্থাপনা, রাস্তাঘাটÑ সবকিছু ছারখার। খাবার নেই, পানি নেই। বিদ্যুৎ-জ্বালানি নেই। বোমায় ঝলসে যাচ্ছে নারী, শিশুÑ সব বয়সি ফিলিস্তিনি। ফুরিয়ে গেছে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী। হাসপাতাল থেকে আহতরা ফিরছে লাশ হয়ে। ইসরায়েল চতুর্দিক অবরোধ করে রাখায় নিষ্পেষিত মানুষের ‘সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত কারাগার’ হিসেবে পরিচিতি উপত্যকাটি যেন কবরস্থানে পরিণত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (১২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গাজার এই পরিস্থিতির বর্ণনা পাওয়া গেছে।
কেউ কেউ বলছেন, হামাস নিধনের নামে বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল। অথচ তাদের না থামিয়ে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় তাতে সায়ও দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি। নিজভূমে পরবাসী ফিলিস্তিনিরা এখন জাতিগত নিধনের শিকার। জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠা করা ইহুদি রাষ্ট্রের পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকদের মুখে এবং তাদের মুখপাত্র বৈশ্বিক গণমাধ্যমে এই বর্বরতার কোনো ছাপ নেই বললেই চলে।
ইসরায়েলে কেন অতর্কিতে এই হামলা, তার ব্যাখ্যা দিয়েছে স্বাধীনতাকমী সশস্ত্রগোষ্ঠী হামাসের মুখপাত্র গাজি হামাদ। তার দাবিÑ ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার সংগ্রামের দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ফেরানোই মূল লক্ষ্য। ইসরায়েলের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আরবদেশগুলোর সম্পর্ক স্থাপনের নয়া তৎপরতা বন্ধ করাও একটি উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে জোরপূর্বক ইহুদি বসতি গড়ে তোলা বন্ধে পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার বিষয়টিও রয়েছে।
একশ বছর ধরে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ৯২ শতাংশ জবরদখল করে নিয়েছে ইসরায়েল। নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। এখন ছিন্নভিন্ন ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাদের কঠোর নজরদারির মধ্যে জীবন কাটাতে হয় ফিলিস্তিনিদের।
জেরুজালেমকে কব্জায় নিয়ে সেখান থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়াতে প্রায়ই তাণ্ডব চালায় কট্টর ইহুদি ও ইসরায়েলি সেনারা। সম্প্রতি পশ্চিম তীর ও আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি সেনা ও ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের হাতে নিহত হয়েছে কয়েকশ ফিলিস্তিনি। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বললেন উল্টো কথা। তার ভাষ্যÑ শতাব্দীজুড়ে ইসরায়েলবিরোধী বিদ্বেষের ধারায় হামাস এই হামলা চালিয়েছে। হামাসের হামলার ফায়দা তুলছে কট্টর ইহুদিরা। শুধু বাইডেন নন, ইসরায়েলের পক্ষে ফুঁসে উঠেছেন ফিলিস্তিন সংকটের গোড়াপত্তন ঘটানো যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতারা। তারা বিশ্ববাসীকে দেখাতে চাইছেন, গাজাসহ ফিলিস্তিনিদের অবশিষ্ট এলাকাগুলোতে তাদের এতদিনের দমনপীড়ন ন্যায্য। নিজেদের যুদ্ধাপরাধ তারা হামাসের অভিযান দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। একই সুযোগে পুরোনো ফিলিস্তিনি মানচিত্রের অবশিষ্ট ছিটেফোঁটা এলাকাও স্থায়ীভাবে দখলে নিতে এখন উদ্ধত তেল আবিব।
তাদের এই হীন প্রচেষ্টার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গাজা উপত্যকা। মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপত্যকায় ২২ লাখ ফিলিস্তিনির বাস। যাদের মধ্যে নিজেদের মতো করে জীবন চালান মাত্র ৫ লাখ ফিলিস্তিনি। বাকি ১৭ লাখই থাকে গাজায় তৈরি করে দেওয়া জাতিসংঘ আশ্রয়শিবিরে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ওষুদের জন্য বিদেশি ত্রাণের ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে একটি সক্রিয় ও স্বচালিত জাতি ছিল ফিলিস্তিনিরা।
লন্ডনভিত্তিক ‘আল-আরাবিয়া’ সংবাদমাধ্যমে এক নিবন্ধে আল-জাবিদ লিখেছেন, ‘ইসরায়েল হামাস নেতৃত্বকে নিধন করছে না, তারা হামাসের হামলার প্রতিশোধও নিচ্ছে না। তারা ২২ লাখ ফিলিস্তিনিকে শাস্তি দিচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘দি ইন্টারসেপ্টে’ ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে গত সোমবার নিবন্ধ লিখেছেন অ্যালিস স্পেইরি। সেখানে তিনি বলেছেন, হামাসের অপরাধের বিপরীতে যুদ্ধাপরাধে নেমেছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনের বেসামরিক নাগকিরদের ওপর বছরের পর বছর নিপীড়ন করেও দায়মুক্তি পেয়ে আসা ইসরায়েলের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন সেই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে গাজার ফিলিস্তিনিদের ওপর নেমে আসা ইসরায়েলি আগ্রাসনের মাধ্যমে। গতকাল বৃহস্পতিবারই ইসরায়েলের বিমান হামলায় ১৫১ জন বেসামরিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এ নিয়ে গত ছয় দিনে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪১৭। আহতের সংখ্যা ৬ হাজার ছাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার গাজায় আন্তর্জাতিক রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্স ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়েছে। এতে রেড ক্রিসেন্টের ছয় সদস্য নিহত হয়েছে। গাজার হাসপাতালগুলোতে কোনো শয্যা তো খানি নেই-ই, উপরন্তু সেখানে চিকিৎসাসামগ্রীও ফুরিয়ে গেছে প্রায়। এই দুর্দশার মধ্যেই আহত শিশু-নারীদের চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
হামাসের হামলায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০০। আহত তিন সহস্রাধিক। গত শনিবার হামলা শুরু করে রবিবার পর্যন্ত লড়াইয়ে টিকে ছিল হামাস। কিন্তু তারপর থেকে শুরু হয় ইসরায়েলি হামলা। যে কারণে এখন ফিলিস্তিনিদের হতাহতের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে।
গাজায় প্রবেশের পথ আছে ১৭টি। এসব পথ দিয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় ফিলিস্তিনিদের শরীর তল্লাশি করে ইসরায়েলি সেনারা। এখন সব গেটই বন্ধ করে দিয়ে সামনে বসে আছে ইসরায়েলি সেনারা। ফলে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ নেই। এ অবস্থাকে মানবাধিকারের পরিপন্থি বলে বর্ণনা করেছে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা।
বিমান ও সমুদ্রবন্দর- সর্বত্রই হামলা করায় অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য ত্রাণ পাঠাতে পারছে না কোনো দেশ। তবে বৃহস্পতিবার মিসর জানিয়েছে, রাফা অঞ্চল দিয়ে গাজায় প্রবেশের পথে ইসরায়েল হামলা চালানোয় সেটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। উত্তর সিনাইয়ের একটি বিমানবন্দরে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছে মিসর। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান বলেছেন, ত্রাণ প্রস্তুত করেও গাজায় পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
গাজায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। হামাস ও ইসরায়েল পরস্পরকে শর্তের জালে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে হামাস সদস্যরা যেসব ব্যক্তিকে ধরে এনে বন্দি করেছে, তাদের মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহ করা হবে না বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার এক্সে (সাবেক টুইটার) দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এ কথা বলেছেন।
ইসরায়েল কাৎজ বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত অপহৃত ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া না হবে, ততক্ষণ গাজায় বিদ্যুতের কোনো সুইচ চালু করা হবে না, পানি সরবরাহের কোনো পথ খুলে দেওয়া হবে না এবং জ্বালানির কোনো ট্যাংক প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
গত শনিবার গাজা থেকে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর টানা ছয় দিন দুইপক্ষের সংঘাত চলছে। এরই মধ্যে সোমবার গাজাকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করার ঘোষণা দেয় ইসরায়েল। ওই ঘোষণা অনুযায়ী উপত্যকাটিতে বিদ্যুৎ, পানি, খাবার ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে।
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান যুদ্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে দৃশ্যপটে হাজির হয়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। যুদ্ধ বন্ধের উপায় নিয়ে ফ্রান্স, তুরস্ক ও ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা-এসপিএ তথ্য জানিয়েছে।
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের অবরোধ ও বোমাবর্ষণের নিন্দা জানিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, গাজায় যা হচ্ছে তা রীতিমতো ধ্বংসযজ্ঞ। বুধবার দেশটির পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীন এ কে পার্টির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ কথা বলেন।
চলমান অবরোধ এবং বিরতিহীন হামলা বন্ধে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এরদোয়ান বলেন, যুদ্ধেরও একটি নৈতিকতা আছে। কিন্তু গাজায় সপ্তাহজুড়ে চলা বিরতিহীন হামলা ও অবরোধ নৈতিকতার মারাত্মক লঙ্ঘন। মানুষকে তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে বাধা দেওয়া এবং বেসামরিক লোকজনের বাসস্থানে বোমা হামলা চালানো হচ্ছে। এটি যুদ্ধ নয়, একটি ধ্বংসযজ্ঞ।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নিপীড়নমূলক নীতি চলমান সংঘাতের মূল কারণ জানিয়ে এরদোয়ান বলেন, ‘ইসরায়েলের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, তারা একটি রাষ্ট্র। তারা সংগঠনের মতো কাজ করতে পারে না।’
তবে পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, ইসরায়েলকে অন্ধ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার তেল আবিবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ব্লিঙ্কেন বলেছেন, ‘আমরা সবসময় ইসরায়েলের পাশে আছিÑ এই বার্তা দিতেই আমার এখানে আসা।’ তিনি আরও বলেন, ‘হামাস যেন আর কখনও এ ধরনের হামলার সামর্থ্য না রাখে, সেটা নিশ্চিত করার অধিকারও ইসরায়েলের আছে।’ তার এই বক্তব্য প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি।
যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি নৌবহর ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েলের জন্য পাঠিয়ে রেখেছে। প্রয়োজনে আরও একটি নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন জো বাইডেন। যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গিবিমানও পাঠিয়েছে। এখন সর্বশক্তি নিয়ে গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেল আবিব। সূত্র : বিবিসি, আলজাজিরা, গালফ নিউজ ও এসপিএ