প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৩ ১৬:০৮ পিএম
আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৩ ০১:৩৭ এএম
ক্যাটালিন ক্যারিকো (বাঁয়ে) ও ড্রু ওয়েজম্যান। ছবি : সংগৃহীত
বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্টি করা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা উদ্ভাবনে অনন্য অবদান রাখা দুই বিজ্ঞানী এবার চিকিৎসাক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। তারা হলেনÑ হাঙ্গেরীয় বিজ্ঞানী ক্যাটালিন ক্যারিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের ড্রু ওয়েইসম্যান। স্মরণকালের ইতিহাসে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দেখা দেওয়া করোনা মহামারির বিরুদ্ধে মানুষের জয়ে দিশা দেখিয়েছে তাদের গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি বহুল কাঙ্ক্ষিত এই টিকা। এমআরএনএ প্রযুক্তির টিকা তৈরির দিশারী তারা দুজন।
সুইডেনের স্টকহোমে ক্যারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটে গতকাল সোমবার চিকিৎসা বা শরীরবৃত্তীয় বিদ্যার ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
মহামারি শুরুর আগে পরীক্ষামূলক অবস্থায় ছিল এমআরএনএ করোনা টিকার প্রযুক্তি। যেখানে চূড়ান্ত সাফল্য আসে ক্যাটালিন ক্যারিকো ও ড্রু ওয়েইসম্যানের নিরলস গবেষণার কারণে। তাদের এমআরএনএ প্রযুক্তিতে তৈরি করোনার টিকায় রক্ষা পেয়েছে বিশ্বের কোটি মানুষের জীবন।
ক্যারিকো ও ওয়েইসম্যানের গবেষণা শুধু করোনার টিকা তৈরিতে থেমে নেই। এখন ঠিক একই ধরনের এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্যানসারসহ অন্যান্য জটিল রোগের প্রতিষেধক তৈরির প্রচেষ্টা এগিয়ে চলেছে।
চিকিৎসায় নোবেল পুরস্কার কাকে দেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব ‘নোবেল কমিটি ফর ফিজিওলজি অর মেডিসিন’-এর। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকপাল প্রতিষ্ঠান ক্যারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটের প্রখ্যাত অধ্যাপকদের নিয়ে গঠিত হয় এই কমিটি। ইমুনোলজির অধ্যাপক গুনিল্লা কার্লসন-হেডেস্টামের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি এবার নোবেলের জন্য ক্যারিকো ও ওয়েইসম্যানকে চূড়ান্ত করে।
ক্যারিকো ও ওসেইম্যানের অবদান সম্পর্কে কমিটির ঘোষণায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মানবস্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বড় হুমকির দিনগুলোতে পুরস্কারজয়ী এই দুজন প্রতিষেধক তৈরিতে অবিশ্বাস্য ভূমিকা রেখেছেন।
ক্যারিকো ও ওয়েইসম্যান ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় একত্রে কাজ শুরু করেন। তারা এমআরএনএ বা মেসেঞ্জার আরএনএ নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা করেন। এমআরএনএ ব্যবহার করে মানবকোষকে ওষুধ ফ্যাক্টরি বানিয়ে ফেলার ধারণাকে একের পর এক পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার জন্য ক্যাটালিন ও ওয়েইসম্যানের অবদান অনেক।
এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হয় বিশ্বখ্যাত ওষুধ কোম্পানি মডার্না, ফাইজার ও বায়োএনটেকের করোনার টিকা। প্রথাগত টিকাগুলো রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার মৃত বা দুর্বল অংশ দিয়ে তৈরি হয়। এর বিপরীত ধারায় কাজ করে এমআরএনএ প্রযুক্তি, যা সক্রিয় কোষে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে।
ক্যারিকো ও ওয়েইসম্যান ২০০৫ সালে এমআরএনএ নিয়ে তাদের গবেষণার ফল প্রকাশ করেন। নোবেল কমিটির ভাষ্যÑ দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে এভাবেই তারা প্রস্তুত করে দেন করোনার টিকার ভিত্তি, যা জানা ইতিহাসে মানবস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় দুর্যোগে ব্যবহার করা হয়েছে।
নোবেলজয়ী দুজনের মধ্যে ক্যাটালিন ক্যারিকোর জীবন নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে। হাঙ্গেরির নাগরিক ক্যারিকোকে পেশাজীবনের শুরুতে চাকরি হারিয়ে শূন্যহাতে ভাগ্যের অন্বেষণে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। তবে দমে যাননি তিনি। তার সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ চিকিৎসাবিজ্ঞানী অ্যান্থনি ফাউচি বলেছেন, এমআরএনএ নিয়ে একেবারে পাগলের মতো লেগে ছিলেন ক্যারিকো।
১৯৮৯ সাল এমআরএনএ নিয়ে বড় বড় গবেষণা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। তখন সেই গবেষণার জন্য বরাদ্দ পান পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী এলিয়ট বারনামন। সেখানে অস্থায়ীভাবে বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দেন ক্যারিকো। তারা এমআরএনএ-কে কোষের ভেতরে ঢোকানোর ওপর গবেষণা শুরু করেন। এই ধাপে সফলতার পর তারা পরবর্তী ধাপের গবেষণায় কোষকে প্রোটিন তৈরির নির্দেশনার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যাবতীয় কাজের জন্য প্রোটিনের ভূমিকা অপরিহার্য। তবে প্রোটিন বানানোই শেষ কথা নয়। নতুন প্রোটিন যে উৎপন্ন হয়েছে, সেটিও প্রমাণ করে দেখাতে হয়। এক্ষেত্রেও সফল হন ক্যারিকো ও এলিয়ট।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ছেড়ে এলিয়ট চলে যান। ক্যারিকো কাজ শুরু করেন ড্রু ওয়েইসম্যানের সঙ্গে। তবে ওয়েইসম্যানের সঙ্গেও তাকে চুক্তিভিত্তিক গবেষক হিসেবেই কাজ করতে হয়। ওয়েইসম্যান জাঁদরেল অধ্যাপক। তার বিপরীতে ক্যারিকো শুধু একজন গবেষক। তবে ক্যারিকো প্রমাণ করে দিয়েছেন, লক্ষ্যে অটল থাকলে একদিন সফলতা আসেই।
সূত্র : নোবেল কমিটির ওয়েবসাইট, বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান