প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৩ ২১:৫৫ পিএম
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৭৫ সালের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হবে ভারত। সূত্র: গোল্ডম্যান স্যাকস
আমার শত্রুর শত্রু, আমার বন্ধু- এই ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। ওয়াশিংটনে একসময়ের নিষিদ্ধ ঘোষিত নরেন্দ্র মোদি এখন ভারতের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রী। চীনের সম্ভাব্য পাল্টা শক্তি হিসেবে ভারতীয় এই নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও প্যারিসে ইমানুয়েল মাখোঁর উষ্ণ আলিঙ্গন করেছেন। চীনকে মোকাবিলায় মোদিকে কাছে টানতে পশ্চিমা শক্তি এই বাজি ধরেছে। ভারত প্রকৃতপক্ষে একটি উদীয়মান শক্তি হয়ে উঠতে পারে। দেশটির সঙ্গে পশ্চিমাদের পারস্পরিক স্বার্থও রয়েছে।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ভারত এখন কোথায় এবং কোথায় যেতে পারে?
বাজারমূল্যের ভিত্তিতে ভারত আজ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম। এর জনসংখ্যা ১৪৩ কোটি, যা প্রায় হুবহু চীনের সমান। তবে জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের জনসংখ্যা হবে ১৬৭ কোটি। আর চীনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৩১ কোটি।
আইএমএফের মতে, ভারতের মাথাপিছু জিডিপি (ক্রয়ক্ষমতায়) চীনের স্তরের প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। ১৯৯০ সালে ভারত এবং চীন উভয়ই প্রায় একই রকম দরিদ্র ছিল। বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে চীনের মাথাপিছু জিডিপি গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের স্তরের ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে, বিপরীতে ভারতের পৌঁছেছে ১১ শতাংশে। অর্থনীতিতে চীনের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে সেরা হলেও ভারত সাতটি বৃহত্তম উদীয়মান অর্থনীতির মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
আধুনিক যুগের সবচেয়ে সফল উন্নয়ন কৌশলের একটি চরম উদাহরণ ছিল চীন। এই কৌশলের মধ্যে ছিল উচ্চ বিনিয়োগ, দ্রুত শিল্পায়ন এবং প্রস্তুতকারকদের পণ্য রপ্তানিতে দ্রুতগতি। জাপানও একই পথ অনুসরণ করেছিল। তবে ভারত ভিন্ন একটি পথ অনুসরণ করেছে। ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতের বিনিয়োগের গড় হার জিডিপির মাত্র ৩১ শতাংশ, আর চীনের ৪৪ শতাংশ। জাতীয় সঞ্চয়ের গড় হার চীনের ৪৫ শতাংশের বিপরীতে ভারতের ছিল ৩০ শতাংশ। ভারতের জিডিপিতে উত্পাদন শেয়ার বাড়ার পরিবর্তে কমছে, যদিও অর্থনৈতিক বিকাশের এ পর্যায়ে এটি প্রত্যাশিত ছিল।
ভারতের সঞ্চয়ের হার যদিও চীনের মতো বেশি নয়, তবে তা যথেষ্ট বেশি, কারণ পুঁজি আমদানির সম্ভাবনা অনেক। ভারতের যুক্তিসঙ্গত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে। উদ্যোক্তা প্রচুর এবং পরিকাঠামো উন্নত হচ্ছে। ভারত নিঃসন্দেহে শ্রমের ঘাটতিতে ভুগবে না।
তবে পর্যাপ্ত ভালো চাকরির সুযোগ তৈরিতে অক্ষমতা ভারতের একটি বড় ব্যর্থতা। আরেকটি হলো জনসংখ্যাকে উচ্চমানের শিক্ষা দিতে ব্যর্থতা। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারও বিরাট। তা সত্ত্বেও ভারত গত ৭৫ বছরে উৎপাদন ও রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের পর থেকে অন্যান্য অনেক দেশের মতোই ভারত খারাপ ঋণের সমস্যায় অত্যধিক ভুগছে, যা প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বাধা।
আইএমএফ ২০২৩ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ভারতের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের একটু বেশি হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। এ ছাড়া অর্থনীতিতে ভারতের এখনও পদক্ষেপ নেওয়ার বিশাল জায়গা রয়েছে। পাশাপাশি ভারত একটি তরুণনির্ভর দেশ, যেখানে শ্রমশক্তির গুণমান উন্নত করার সম্ভাবনা রয়েছে, যুক্তিসঙ্গতভাবেই সঞ্চয় হার বাড়ার পাশাপাশি দেশটির বৃহত্তর সমৃদ্ধির ব্যাপক আশা রয়েছে।
ভারত ২০৫০ সাল পর্যন্ত বছরে ৫ শতাংশ বা তার বেশি হারে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আরও ভালো নীতি যদি যুক্ত হয় তবে প্রবৃদ্ধি আরও কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে এই প্রবৃদ্ধি নানা কারণে কমেও যেতে পারে।
তবে মোটা দাগে ধরে নেওয়া যায় ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বছরে গড়ে ৫ শতাংশ হারে বাড়া অব্যাহত থাকবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়ছে ১.৪ শতাংশ হারে। ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি (ক্রয়ক্ষমতায়) যুক্তরাষ্ট্রের স্তরের প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছে যাবে, মোটামুটিভাবে চীন আজ এই স্তরে রয়েছে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুসারে, ভারতের জনসংখ্যাও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৪.৪ গুণ বেশি হবে। সুতরাং, ভারতের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বড় হবে।
সামগ্রিকভাবে, ভারত একটি বড় শক্তিতে পরিণত হবে বলে অনুমান করাটা বেশ যুক্তিসঙ্গত। এটি কল্পনা করা এতটা কঠিন নয় যে, এর অর্থনীতি ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মতো হবে।
এ ছাড়া চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা প্রকল্পের তথ্য বলছে, ২০৭৫ সাল নাগাদ চীনকে টপকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে ভারত। বর্তমানে ভারত বিশ্বে পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। গোল্ডম্যান স্যাকস বলছে, দেশটি যে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, সেটি অনেকেই হয়তো সেভাবে জানে না। তবে তাদের জিডিপির বৃদ্ধিতে যে শুধু এ বিষয়টিই ভূমিকা রাখবে, ব্যাপারটি এমন নয়। কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ ছাড়া ভারতে কর্মহীন ও কর্মের সঙ্গে যুক্ত মানুষের অনুপাত তথা ডিপেন্ডেন্সি রেশিও কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে আয় বাড়বে, সঞ্চয় হার বাড়বে এবং আর্থিক খাতের ব্যাপক উন্নয়ন হবে। এসবের জেরে বিনিয়োগ আরও বাড়বে। কাজেই পশ্চিমা নেতারা ভারতের সঙ্গে যে বাজি ধরছেন, তা বুদ্ধিদীপ্ত।
লিখেছেন মার্টিন উলফ। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, লন্ডনের প্রধান অর্থনীতি ভাষ্যকার। তিনি ২০০০ সালে অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকতার সিবিই (কমান্ডার অব ব্রিটিশ এমপায়ার) উপাধিতে ভূষিত হন।