প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৩ ২২:২৬ পিএম
আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৩ ১১:৫১ এএম
ইউক্রেনকে ক্লাস্টার বোমা সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন। আর সে সিদ্ধান্তে অস্বস্তি প্রকাশ করেছে তাদের বেশ কয়েকটি মিত্র দেশ। গত শুক্রবার ইউক্রেনে ওই বিতর্কিত অস্ত্র পাঠানোর ব্যাপারে নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ভাষ্যে এটি ‘খুব কঠিন সিদ্ধান্ত’।
তবে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তের প্রশ্নের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও স্পেন। বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে ক্লাস্টার বোমা নিষিদ্ধ। কারণ এর জেরে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতিটাই সহ্য করতে হয় বেসামরিক মানুষের।
ক্লাস্টার বোমা মূলত ছোট ছোট অনেক বোমা। এগুলো লক্ষ্যবস্তুতে একত্রে নিক্ষেপ করা হয়। এতে বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে ধ্বংসলীলা চলে আর তাতে প্রাণ হারায় মানুষ। কোনো কারণে বোমা বিস্ফোরিত না হলে তা বছরের পর বছর মাটিতে পড়ে থাকতে পারে এবং যেকোনো সময় তার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। বোমা অবিস্ফোরিত থাকার হার নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সালিভান সাংবাদিকদের বলেন, ইউক্রেনে পাঠানো মার্কিন ক্লাস্টার বোমাগুলোর ব্যর্থ হওয়ার রেকর্ড রাশিয়ার গুলোর তুলনায় অনেক কম। রাশিয়া এরই মধ্যে চলমান সংঘাতে ওই বোমা ব্যবহার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার ভাষ্যে এটি ‘সময়োপযোগী, বিস্তৃত এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয়’ একটি সামরিক সহায়তা প্যাকেজ।
বাইডেন গত শুক্রবার সিএনএনকে জানান, তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিত্রদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ক্লাস্টার বোমাগুলো মূলত ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সামরিক সহায়তা প্যাকেজের অংশ।
সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিশ্চিত হতে কিছুটা সময় লেগেছে জানিয়ে প্রেসিডেন্ট জানান, ইউক্রেনীয়দের গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত ওই বোমা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ক্লাস্টার বিস্ফোরক ‘সংঘাত শেষ হওয়ার অনেক পরও বেসামরিক মানুষের জীবনের জন্য বড় ধরনের হুমকির কারণ হয়ে থাকে।’
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্ররা ওই সিদ্ধান্তকে সমর্থন দেয়নি। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বলেন, ‘ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রবিষয়ক কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী ১২৩টি দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্য একটি, যারা এ-জাতীয় অস্ত্র উৎপাদন বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে এবং অস্ত্রটি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করেছে।’
স্পেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিটা রবলেস বলেছেন, এ ধরনের অস্ত্র এবং বোমা ইউক্রেনে যে পাঠানো যাবে না, সে বিষয়ে তার দেশ ‘দৃঢ় অবস্থান’-এ রয়েছে।
কানাডার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা শিশুদের ওপর ওই বোমার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে বোমার বহু বছর ধরে অবিস্ফোরিত থাকার বিষয়টি নিয়ে।
কানাডা আরও জানিয়েছে, তারা ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিল এবং দেশটি ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের কনভেনশনের শর্তগুলো পুরোপুরি মেনে চলে। দেশটি বলেছে, ‘আমরা কনভেনশনের দেওয়া শর্তগুলোকে গুরুত্বসহকারে মেনে চলি এবং সবাই যেন তাই করে সে জন্য উৎসাহিত করি।’
যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও রাশিয়া এখনও ওই চুক্তিতে কোনো স্বাক্ষর করেনি। বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, মস্কো ও কিয়েভ দুই পক্ষই যুদ্ধে ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার করেছে।
চুক্তি স্বাক্ষরকারী আরেক দেশ জার্মানি বলেছে, তারা ইউক্রেনকে এ ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করবে না। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বুঝতে পেরেছে। জার্মান সরকারের মুখপাত্র স্টেফেন হেবস্ট্রেইট বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত যে আমাদের মার্কিন বন্ধুরা এ ধরনের গোলাবারুদ সরবরাহের সিদ্ধান্তকে হালকাভাবে নেয়নি।’
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, ক্লাস্টার বোমাগুলো শুধু শত্রুর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে ফেলার লক্ষ্যে ব্যবহার করা হবে, শহরাঞ্চলে নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এক আইনে কোনো অস্ত্রের ব্যর্থতার হার ১ শতাংশের বেশি হলে সেটির উৎপাদন, ব্যবহার বা স্থানান্তর নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্লাস্টার বোমার ব্যর্থতার হার ১ শতাংশের বেশি। সে হিসাবে বাইডেনের পদক্ষেপ মার্কিন আইন লঙ্ঘন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সালিভানের দেওয়া তথ্যানুসারে, মার্কিন ক্লাস্টার বোমার ব্যর্থতার হার আড়াই শতাংশের কম। অন্যদিকে রাশিয়ার ক্লাস্টার বোমার ব্যর্থতার হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।
ইউএস ক্লাস্টার মিউনিশন কোয়ালিশন সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে জানিয়েছে, সেটি ‘আজ ও আগামী কয়েক দশকের জন্য বড় ধরনের দুর্ভোগ বয়ে আনবে।’
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর থেকেও এর সমালোচনা করা হয়েছে। সেখানকার এক প্রতিনিধি বলেন, ‘এ ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত এবং কোনো জায়গায় তা ব্যবহার করা উচিত নয়।’
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র এই পদক্ষেপকে ‘বেপরোয়া পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভাও বলেছেন, ‘ইউক্রেনের আশ্বাস যে তারা ওই ক্লাস্টার বিস্ফোরক দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করবে। কিন্তু তাদের এমন বক্তব্য মূল্যহীন।’
প্রসঙ্গত, গত মাসে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে ইউক্রেন। পূর্ব দোনেৎস্ক এবং দক্ষিণ-পূর্ব জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে এখনও চলছে তাদের সে অভিযান। তবে গত সপ্তাহে ইউক্রেনের সামরিক কমান্ডার-ইন-চিফ ভ্যালেরি জালুঝনি জানান, পর্যাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্রের অভাবের কারণে অভিযানটি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পশ্চিমাদের প্রতিশ্রুত অস্ত্রের ধীরগতি নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। সূত্র : বিবিসি