× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১০:৪১ এএম

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:২৯ পিএম

সমুদ্রে রুশ গ্যাস পাইপলাইনে ছিদ্র

সমুদ্রে রুশ গ্যাস পাইপলাইনে ছিদ্র

জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির পাইপলাইনে অল্পদিনের মধ্যে চারটি ছিদ্র হওয়ায় রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে একে দুর্ঘটনা মনে করা হলেও বৃহস্পতিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সুইডেনের কোস্ট গার্ড চতুর্থ ছিদ্রের খবর দিলে প্রশ্ন ওঠে এটি নাশকতা কি না এবং এখানে রাশিয়ার কৌশল রয়েছে কি না। তবে রাশিয়া বলছে, গ্যাস পাইপলাইনে ছিদ্র আমেরিকা-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে। 

ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর অর্থনৈতিকসহ নানা বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার হুমকি দিয়ে আসছে রাশিয়া। পাশাপাশি কারিগরি ত্রুটিসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখাচ্ছে। 

সমুদ্রের নিচ দিয়ে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে জার্মানির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গেছে নর্ড স্ট্রিম-১ ও নর্ড স্ট্রিম-২ নামে দুটি গ্যাস পাইলাইন। দুটি লাইনে মোট চারটি ছিদ্র পাওয়া গেছে। প্রথম ছিদ্রটি ধরা পড়ে চলতি মাসের প্রথমদিকে। ১২০০ কিলোমিটার লম্বা এসব পাইপলাইনের বড় অংশের মালিকানা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রমের। বাকিটা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের। ছিদ্রগুলোর মধ্যে ডেনমার্কের জলসীমায় হয়েছে দুটি। অন্য দুটি ছিদ্র হয়েছে সুইডেনে জলসীমায়। এতে কয়েকশ মিটার এলাকায় বুদ্বুদ উঠছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাসলাইনগুলো পরিদর্শন করা যায়নি। ওই এলাকায় নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ারও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাইপলাইন ছিদ্র হওয়ায় বোর্নহোম দ্বীপ এলাকায় নয় কিলোমিটার পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলে বিবিসি জানিয়েছে।

ডেনমার্কের জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, গত সোমবারই তারা পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তা নিয়ে কাজ শুরু করে কর্তৃপক্ষ। তবে নিষিদ্ধ এলাকার বাইরে পাইপলাইন ফুটো হওয়ার প্রভাব পড়বে না। কীভাবে এই ছিদ্র হয়েছে বা কতটুকু ছিদ্র হয়েছে তা নিশ্চিত নয় কোনো পক্ষ। তবে ভূকম্পন বিশেষজ্ঞদের দাবি, ডেনমার্ক উপকূলে বাল্টিক সাগরে মঙ্গলবার বিস্ফোরণ হয় দুটি পাইপলাইনের কাছে। এটা যে বিস্ফোরণ ছিল এতে কোনো সন্দেহ দেখছেন না সুইডেন ন্যাশনাল সিসমোলজি সেন্টারের বিশেষজ্ঞ জর্ন লুন্দ।

পাইপলাইনের ছিদ্র এখনও কেউ দেখতে যায়নি। দেখতে যাওয়া এখনও নিরাপদ না। জার্মানি জানিয়েছে তারা এ বিষয়ে কাজ করছে। আর সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী মাগদালিনা অ্যান্ডারসন বলেছেন, সুইডিশ সশস্ত্র বাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ ও সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সবাই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

পাইপলাইনে ছিদ্রের জন্য ইউক্রেন ইতোমধ্যেই রাশিয়াকে দায়ী করেছে। ইউক্রেন একে রাশিয়ার সন্ত্রাসী হামলা বলে দাবি করেছে। ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পোদোলিয়াক বলেন, ‘ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে নিশানা করে আগ্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। এটি রাশিয়ার সন্ত্রাসী হামলা। ইউরোপকে অস্থিতিশীল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে পাইপলাইনে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।’ তবে তিনি তার দাবির পেছনে কোনো প্রমাণ দেননি।

চলতি বছর ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলায় নাখোশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের মিত্র আমেরিকা নানাবিধ বিধিনিষেধ আরোপ করে রাশিয়ার ওপর। এতে বেশ বেকায়দায় পড়ে রাশিয়া। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া ইউরোপে জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানি কমিয়ে দেয়; বন্ধ করার হুমকি দেখায়; এবং রপ্তানিমূল্য রুবলে পরিশোধে বাধ্য করে ইউরোপের আমদানিকারকদের। এতে রুবল শক্তিশালী হয় আর দুর্বল হয় ইউরো। জ্বালানির জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশেষ করে জার্মানি ব্যাপকভাবে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির অভাবে জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উৎপাদন কমে বেকারত্ব বেড়েছে; জ্বালানি বাবদ ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার মান কমে গেছে; তাদের হতাশার পরিমাণ বেড়েছে; এবং আসন্ন শীত মৌসুমে ঘর গরম রাখার উপায় নিয়ে গভীয় দুশ্চিন্তায় রয়েছে সে দেশের মানুষ। কিন্তু পশ্চিমা রাজনীতিকরা ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন মেনে নেয়নি। ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হওয়ার উদ্যোগ নিলে রাশিয়া নিরাপত্তার কথা বলে ইউক্রেনে হামলা চালায়।

ছিদ্র হওয়ার কারণ জানা না গেলেও পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এর জন্য নাশকতাকেই দায়ী করেছেন। তিনি এর কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রী নাশকতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে বক্তব্য দিয়েছেন।

পাইপলাইনের ছিদ্র ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ম্যাথিউজ মনে করেন, তারা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘কী ঘটেছে তা আমরা বিস্তারিত জানি না, কিন্তু স্পষ্টত একটি নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড দেখতে পাচ্ছি।’ এটা হয়তো ইউক্রেইন পরিস্থিতির চেয়ে আরও বড় কিছু হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তিনি মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রও অভিযোগ করেছে, এসব বিস্ফোরণের পেছনে যারা রয়েছেন তারা রাশিয়া ছাড়া আর কেউ না।

রাশিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রাশিয়া পাইপলাইনের ক্ষতি করবে এই চিন্তা হাস্যকর। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ‘গ্যাস পাইপলাইনের এই ক্ষতি একটি সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নির্দেশ করেছে। ধ্বংসের মাত্রা ইঙ্গিত দেয় যে এটি সত্যিই একটি সন্ত্রাসী কাজ। এটা কল্পনা করা খুব কঠিন যে এ ধরনের একটি সন্ত্রাসী কাজ কিছু রাষ্ট্রীয় শক্তির সম্পৃক্ততা ছাড়া ঘটতে পারে।’ আজ শুক্রবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসার কথা রয়েছে।

এটা এমন ধরনের ছিদ্র, যার মানে হলো এসব পাইপলাইন দিয়ে আসন্ন শীতে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে না। এমনকি মেরামত করার পরও না এমনই মনে করছেন ইউরেশিয়ার বিশ্লেষকেরা। এমনকি পাইপলাইনগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা করছেন অনেকে। বিশ্লেষক হেনিং গ্লোইস্টেইন মনে করেন, ‘ছিদ্রের আয়তন ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা দেখে মনে হচ্ছে, পাইপলাইনগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটা গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।’ এমনকি বিশ্লেষক জেসন বুশ আশঙ্কা করেন, ‘এখন যদি রাশিয়া এই পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ না করে তাহলে তা নিরাপত্তাঝুঁকি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।’

তবে ফাটা লাইন দিয়ে রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখবে কি না তা এখনও কেউ বলতে পারেননি। যদি রাশিয়া ফাটা লাইন দিয়ে গ্যাস সরবরাহ রাখে তাহলে তা হবে রাশিয়ার নতুন একটি যুদ্ধ এবং পাইপলাইন ছিদ্র হওয়ার পেছনে তাদের হস্তক্ষেপ রয়েছে বলেও ধরে নিতে হবে।

রয়েল ড্যানিশ ডিফেন্স কলেজের সেন্টার ফর মেরিটাইম অপারেশন গবেষক অ্যান্ডার্স পাক নিলসেন একই আশঙ্কার কথা বলেন। তিনি মনে করেন, ‘ছিদ্রটা এমন সময় হলো যখন নতুন উপায়ে নরওয়ের গ্যাস পোল্যান্ডে নেওয়ার চেষ্টা চূড়ান্ত হয়েছে। এতে ইউরোপে গ্যাসের বাজারে আরও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এতে কে লাভবান হবে? এতে এ মুহূর্তে একজনই লাভবা হবে। তারা হলো রাশিয়া।’

পাইপলাইন দিয়ে গ্যাস বের হওয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সেটা নির্ভর করছে কী পরিমাণ গ্যাস বের হবে তার ওপর। গ্যাসের পরিমাণ অনুমান করতে পারলেও ডেনমার্কের জ্বালানি সংস্থার প্রধান ক্রিসটোফার বলেছেন, ‘এসব ছিদ্র বা ফাটল খুবই বড়। নর্ড স্ট্রিম-২ দিয়ে গ্যাস বের হওয়া বন্ধ হতে এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।’ 

গ্যাসের কারণে ওই অঞ্চলের সমুদ্রে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া এই গ্যাস বাতাসে মিশে বায়ুদূষিত করতে পারে বলে পরিবেশবাদীরা মনে করছেন।

প্রবা/রাই/ এসআর

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা