প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৩ ১১:০৮ এএম
বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো বর্তমানে ২০টিরও বেশি ধরনের বাস্তুতন্ত্রের ভয়াবহ পরিবর্তন রেকর্ড করেছে। ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে রেইনফরেস্টগুলো সাভানা বা কৃষিজমিতে পরিণত হচ্ছে। সাভানা ক্রমাগত শুকিয়ে যাচ্ছে এবং মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। তুষার আচ্ছাদিত তুন্দ্রা অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে।
সাভানা হচ্ছে ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের মিশ্রণে তৈরি একটি বাস্তুতন্ত্র। এখানে অসংখ্য বৃক্ষ পাশাপাশি অবস্থান করে কিন্তু খুব বেশি কাছাকাছি থাকে না। এর ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে সূর্যের আলো মাটিতে পড়ে এবং সহজেই ঘাস জন্মাতে পারে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো বর্তমানে ২০টিরও বেশি ধরনের বাস্তুতন্ত্রের ভয়াবহ পরিবর্তন রেকর্ড করেছে। এসব বাস্তুতন্ত্র ‘টিপিং পয়েন্ট’ অতিক্রম করেছে। ছোট পরিবর্তন বা ধারাবাহিক ঘটনাগুলো যে জায়গায় এসে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে একটি বড় গুরত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে, তাকে টিপিং পয়েন্ট বলা হয়ে থাকে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো বলছে, বিশ্বজুড়ে ২০ শতাংশেরও বেশি বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পতনগুলো ধারণার চেয়ে তাড়াতাড়ি ঘটতে পারে। মানুষ ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপায়ে বাস্তুতন্ত্রকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। এই চাপগুলোর সঙ্গে যখন চরম আবহাওয়া যুক্ত হচ্ছে, তখন এই টিপিং পয়েন্ট অতিক্রম করার সময় ধারণার ৮০ শতাংশের মতো এগিয়ে আসবে। অর্থাৎ খুব শিগগিরই বাস্তুতন্ত্রগুলো ভেঙে পড়তে পারে।
এর আগে ধারণা করা হয়েছিল, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বাস্তুতন্ত্রের পতন ঘটবে। নেচার সাসটেইনেবিলিটিতে প্রকাশিত সর্বশেষ গবেষণায় বলা হয়েছে, পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যেই এটি ঘটতে পারে।
মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাহিদা বৃদ্ধি এবং গ্রিন হাউস গ্যাস বাড়ার সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ ও বিশুদ্ধ পানির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবাগুলো বজায় রাখতে বাস্তুতন্ত্র ও ভূমির ওপর চাপ বাড়ছে। এ কারণে জলবায়ুসম্পর্কিত ভয়াবহ ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে, যা ক্রমাগত খারাপ হবে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ুর এই পরিবর্তন ইতোমধ্যেই চাপে থাকা বাস্তুতন্ত্রকে ভয়াবহ আঘাত করতে পারে, যা উদ্বেগের কারণ। আর একটি বাস্তুতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তা ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে অন্য বাস্তুতন্ত্রে আঘাত করে, যার পরিণতি বিপর্যয়কর।
ফিডব্যাক লুপ হলো একটি সিস্টেমের অংশ, যেখানে সিস্টেমের আউটপুট ভবিষ্যতের ক্রিয়াকলাপের জন্য ইনপুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে একটি পরিবর্তন পুনরায় একই ধরনের পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন দাবানলের কারণে গাছের কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এই কার্বনের কারণে পৃথিবী আরও উত্তপ্ত হয়। ফলে আরও বেশি দাবানল ঘটে। অর্থাৎ চক্রবৃদ্ধি হারে খুব দ্রুত ঘটতে থাকে।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ার আগে কী পরিমাণ চাপ নিতে পারে, তা বুঝতে চেয়েছিলেন। তারা যেসব মডেল ব্যবহার করেছেন, প্রতিটি মডেলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো ফিডব্যাক মেকানিজমের উপস্থিতি, যা সিস্টেমকে ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে; যখন চাপগুলো দুর্বল হয়। উদাহরণস্বরূপ চিলিকা হ্রদের জেলেরা প্রাপ্তবয়স্ক মাছ ধরতে পছন্দ করে, যখন মাছের মজুদ প্রচুর থাকে। পর্যাপ্ত প্রাপ্তবয়স্ক মাছের উপস্থিতি থাকায় বংশবৃদ্ধির জন্য কিছু মাছ বাকি থাকে। এর ফলে এই মাছের পরিমাণ স্থিতিশীল থাকতে পারে। চাপ যখন বেড়ে যায় তখন বাস্তুতন্ত্র হঠাৎ করে না ফেরার বিন্দু তথা টিপিং পয়েন্ট অতিক্রম করে এবং ভেঙে পড়ে। চিলিকায় এটি তখনই ঘটতে পারে, যখন জেলেরা অভাবের সময় ছোট মাছ ধরা বাড়িয়ে দেয়। ফলে মাছের বংশবৃদ্ধি ক্রমাগত হ্রাস পেতে শুরু করে।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় ব্যবহৃত সফ্টওয়্যারটি ৭০ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন সিমুলেশন মডেল করতে ব্যবহার করেছেন। তাতে দেখা গেছে, বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ার বিষয় নিয়ে আগে যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তার ৩০ থেকে ৮০ শতাংশ আগেই এ ঘটনা ঘটবে।
এর আগে ২০৯০-এর দশকে বাস্তুতন্ত্রের পতনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হলে ৮০ শতাংশ সময় এগিয়ে আসবে। সেক্ষেত্রে ২০৩০-এর দশকেই বাস্তুতন্ত্রের পতন ঘটতে পারে।
সূত্র : সায়েন্স অ্যালার্ট