প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৩ ২১:৪৬ পিএম
আটলান্টিকে ঢুবে যাওয়া টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ।
টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখতে গিয়ে ডুবোজাহাজ টাইটানের ধ্বংস হওয়ার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ আরোহী। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এখন সরগরম এটি নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, গভীর সমুদ্রে এরকম অভিযানের ক্ষেত্রে কী ধরনের ঝুঁকি থাকে?
এ সংক্রান্ত প্রথম ঝুঁকিটিই হলো গভীর সমুদ্রে ডুবোযান পরিচালনা। সমুদ্রের গভীরে পুরোপুরি অন্ধকার থাকে। সাগরের পানি খুব দ্রুত সূর্যালোক শোষণ করে নেয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ ৩,৩০০ ফুট পর্যন্ত সূর্যালোক পৌঁছতে পারে। এরপর আর আলো পৌঁছায় না। টাইটানিক যে জায়গায় ডুবে আছে সেটি ‘মিডনাইট জোন’ নামে পরিচিত।
সাবমার্সিবল নিয়ে এর আগে ওই জায়গায় ঘুরে আসা ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্য দিয়ে দু’ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সাগরের গভীরে নামতে হয়েছিল তাদের। এরপর অনেকটা হঠাৎ করেই সমুদ্রের তলদেশ এবং টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষের কাঠামো ফুটে উঠতে শুরু করে। সাধারণত সাবমার্সিবল আকৃতি একটা ট্রাকের সমান হয়ে থাকে। এর লাইটের আলোয় কয়েক মিটারের বেশি দেখা যায় না।
ফলে দিক হারানোর সম্ভাবনা থাকে বেশি। আর এ কারণেই গভীর সমুদ্রে ডুবোযান পরিচালনা করা চ্যালেঞ্জিং কাজ।
দ্বিতীয় ঝুঁকিটি হলো সাগরের গভীরে পানির ব্যাপক চাপের বিষয়টি। সমুদ্রের যত গভীরে যাওয়া হবে, পানির চাপ ততই বাড়তে থাকবে। সমুদ্রতলের ১২,৫০০ ফুট পানির নিচে রয়েছে টাইটানিক। এই ধ্বংসাবশেষ এবং তার চারপাশের সবকিছু প্রায় ৪০এমপিএ চাপ সহ্য করছে। সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিলিয়েন্স সেন্টারের সমুদ্রবিষয়ক গবেষক রবার্ট ব্লাসিয়াক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বোঝানোর জন্য বলছি, ওখানে পানির চাপ আপনার গাড়ির টায়ারের চাপের প্রায় ২০০ গুণ বেশি। তাই আপনার প্রয়োজন হবে এমন একটি সাবমার্সিবল যার দেয়াল সত্যিই অনেক পুরু।’
টাইটান সাবমার্সিবলটির দেয়াল কার্বন ফাইবার ও টাইটানিয়াম দিয়ে তৈরি। ফলে এটি সর্বোচ্চ ১৩,১২৩ ফুট পর্যন্ত গভীরতায় পৌঁছাতে পারে।
গভীর সমুদ্রের চোরা স্রোত হলো তৃতীয় ঝুঁকি। সমুদ্রের উপরিভাগের মতো নিচেও রয়েছে স্রোত। এসব স্রোত সমুদ্রপৃষ্ঠের স্রোতের মতো শক্তিশালী না হলেও এগুলোর কারণে প্রচুর পানি এদিক-ওদিক হয়। এ ছাড়াও সমুদ্রপৃষ্ঠের বাতাস নিচের পানির স্তম্ভকেও প্রভাবিত করতে পারে। গভীর পানির মধ্যে জোয়ার-ভাটা কিংবা তাপমাত্রা এবং লবণাক্ততার কারণেও পানিতে ঘনত্বের পার্থক্য দেখা দিতে পারে। এটি থার্মোহেলাইন স্রোত নামে পরিচিত।
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন এ ধরনের স্রোতের কারণে তলদেশের টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ শেষ পর্যন্ত পলিমাটিতে চাপা পড়বে। সামুদ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক গেরহার্ড জিফার্ট জানান, সেখানের স্রোত সাবমার্সিবলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তবে বিদ্যুৎ শক্তি ঠিক থাকতে হবে যানটিতে। নাহলে বিপাকে পড়ার ঝুঁকি আছে।
সমুদ্রতলে ১০০ বছরেরও বেশি সময় পার হওয়ায় টাইটানিক ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গেছে। শুরুর দিকে ডুবে যাওয়ার পর জাহাজের দুটি প্রধান অংশের সঙ্গে যখন সমুদ্রতলের সংঘর্ষ ঘটে তখন এর বড় অংশগুলো বিকৃত হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকটেরিয়া জীবাণু জাহাজের লোহা খেয়ে ফেলে বরফের আকৃতির ‘রাস্টিকল’ তৈরি করে ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করেছে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, জাহাজের পেছনের অংশে ব্যাকটেরিয়ার তৎপরতা বেশি, কারণ ওই অংশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি। জাহাজের সামনের অংশের তুলনায় সেটি ৪০ বছর আগে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। এটিও একটি ঝুঁকি।
জিফার্ট জানান, ক্ষয়ের কারণে জাহাজের কাঠামো ক্রমাগত ধসে পড়ছে। প্রতি বছর অল্প অল্প করে ক্ষয় হচ্ছে। যতক্ষণ নিরাপদ দূরত্ব বজায় থাকবে, কোনো কিছু ধরা হবে না, খোলের ভেতরে ঢোকা হবে না, ততক্ষণ ক্ষতি হওয়ার কথা নয়।
পলিমাটির কারণে সাগরতলের অস্থিতিশীল পরিবেশ হলো আরও একটি ঝুঁকি। টাইটানিক ধ্বংসাবশেষের চারপাশের সমুদ্রতল সুদূর অতীতে বিশাল ভূমিধসের কবলে পড়েছিল বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা একে ‘অস্থিতিশীল করিডোর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নিউফাউন্ডল্যান্ড থেকে আসা বিশাল পরিমাণ পলি পড়ে এটা তৈরি হয়েছে বলেও অনুমান করছেন তারা। এ ছাড়াও ধ্বংসাবশেষের চারপাশে অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য রয়েছেÑ যা এখনও অজানা রয়ে গেছে। যেমনÑ ওশানগেটের সঙ্গে টাইটানিকের ধ্বংসস্তূপে আগে চালানো এক অভিযানে ফরাসি নৌবাহিনীর প্রাক্তন ডুবুরি ও ডুবোজাহাজ পাইলট পল-হেনরি নারজিওলেট সোনার যন্ত্রে রহস্যময় শব্দ শুনতে পান। পরে দেখা যায়, সেটি সামুদ্রিক প্রাণী দিয়ে ঢাকা পাথুরে দেয়াল। সর্বশেষ অভিযানে টাইটানিক ধ্বংসাবশেষের কাছে আরও একটি সোনার সিগন্যাল সম্পর্কে তদন্ত করতে চেয়েছিলেন তিনি।
মূলত টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখার ঝুঁকিগুলো ১৯৮৬ সালের মতো এখনও প্রাসঙ্গিক। ১৯৮৬ সালেই প্রথমবারের মতো মানুষ সমুদ্রের গভীরে যাত্রা করে। সূত্র : বিবিসি